সউদী ক্রাউন প্রিন্স এর ‘মোডারেট ইসলাম’ এর ঘোষণা: রহস্যের সন্ধানে

22894332_10210820448007360_3762328627081230227_n

ولي عهد المملكة العربية السعودية: نعود إلى الإسلام الوسطي المعتد

সউদী ক্রাউন প্রিন্স এর ‘মোডারেট ইসলাম’ এর ঘোষণা:

রহস্যের সন্ধানে

সম্প্রতি সউদী ক্রাউন প্রিন্স এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহাম্মদ বিন সালমান এর এর ‘মোডারেট ইসলাম’ দিকে ফিরে যাওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে অনলাইন-অফলাইন জগতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে একে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করে সমর্থন করেছে আবার অনেকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে। কিছু মানুষ অত্যন্ত অশালীন ও বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় সউদী সরকার ও রাজপরিবারের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে চলেছে।

তাই আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষক না হয়েও মূল বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। আর সে জন্য প্রথমত: প্রিন্সের সরাসরি আরবি বক্তব্যটি শুনলাম।

❖ তথ্য গোপন:

বক্তব্য শোনার পর মনে হয়েছে, অনেক সমালোচক ঘটনার আগে-পরে কিছু না জেনে শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে সমালোচনা করছেন। অনেকেই অসৎ উদ্দেশ্যে সুকৌশলে কিছু বিষয় এড়িয়ে গেছেন। তারা কেবল ‘মোডারেট ইসলামে’ ফিরে যাওয়ার কথাটি ঘুরিয়ে -পেঁচিয়ে বলার চেষ্টা করছে কিন্তু এ ক্ষেত্রে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট গোপন করার চেষ্টা করেছে। আর সেটা হল, একটি নির্দিষ্ট সন। তারা কেন সে সনটা গোপন করার চেষ্টা করেছেন? হয়তবা এখানেই রহস্য দানা বেঁধে আছে। এটির ব্যাখ্যা স্পষ্ট হয়ে গেলেই তাদের থলের বিড়ার বেরিয়ে যাবে।
❖ প্রিন্সের বক্তব্য:

যাহোক, তাহলে আসলে তিনি কী বলেছেন সেটা প্রথমে জানা যাক।
মোডারেট ইসলামে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছেন তা নিম্নরূপ:

“আমরা কেবল ১৯৭৯ সালের আগের মধ্যপন্থী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমগ্র বিশ্ব,
সকল ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সামনে উন্মুক্ত ইসলামের দিকে ফিরে যেতে চাই। আমরা এমন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাই যাতে আমাদের সুমহান দ্বীন, আমাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভালো দিকগুলো প্রতিফলিত হবে। চাই বিশ্বের সাথে মিলে-মিশে বসবাস করে আমাদের দেশ ও বৈশ্বিক উন্নয়নের অংশীদার হতে।
আমি বিশ্বাস করি, এ এব্যাপারে ইতোপূর্বে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আরও মনে করি, আমরা খুব শীঘ্রই অবশিষ্ট চরমপন্থার বিনাশ সাধন করব। এটিকে চ্যালেঞ্জ মনে করি না। কেননা, আমরা উদার, মধ্যপন্থা ও সঠিক মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করি। আর এটি আমাদের বিষয় এবং আমাদেরই অধিকার। সুতরাং এটি অস্থিরতার কোন কারণ নয়।”

❖ রহস্যের সন্ধানে:
এখন প্রশ্ন হল, ১৯৭৯ সালকে উল্লেখ করে তিনি কিসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন? বা এই সালটিকে নির্দিষ্ট করার কারণ কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, ১৯৭৯ সালকে নির্দিষ্ট করার একাধিক কারণ থাকতে পারে। তন্মধ্যে কিছু কারণ নিম্নরূপ:

❍ ১) এ সালে ইরানে শিয়া রাফেযীদের কথিত ‘ইসলামী বিপ্লব’ সংঘটিত হয়।
এর পর ইরান তাদের আইডোলজি মুসলিম দেশে দেশে রপ্তানি করে। যার কারণে এই কথিত বিপ্লবের রসদ ও রূপরেখা নিয়ে ইসলামী দেশগুলোতে বিভিন্ন ‘ইসলামী আন্দোলন’ প্রবল বেগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। যাদের ইসলামী বিপ্লবের রোল মডেল হল শিয়া ইরান। (আরব বিশ্বে বা আরবের বাইরের সে সব ‘ইসলামী আন্দোলন’ এর নাম সবার জানা)

❍ ২) একই বছরে ইসলামী জাগরণ আর সংস্কারের নামে সউদী নাগরিক জুহাইমান আল উতাইবীর নেতৃত্বে এক উগ্রপন্থী গ্রুপ পবিত্র বায়তুল্লাহ দখল করে মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত ন্যক্কার জনক কালো ইতিহাস সৃষ্টি করে।

❍ ৩) একই বছরে আফগানিস্তান-সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তারপর সেই যুদ্ধ ফেরত মুজাহিদদের অনেকেই মুসলিম দেশগুলোতে বিভিন্ন জঙ্গি চিন্তাধারা নিয়ে ফিরে আসেন এবং জিহাদি সংগঠন গঠন করে। সে সকল জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম হল, সউদী নাগরিক উসামা বিন লাদেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আল কায়েদা (গঠনকাল ১৯৮৮)। এই জঙ্গি সংগঠন সউদী আরব সরকার ও রাষ্ট্র যন্ত্রকে কাফের-মুরতাদ ঘোষণা করে সউদী আরবে বহু স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সউদী আরবের অসংখ্য নিরাপত্তা কর্মী, বিদেশী নাগরিক এবং সাধারণ নাগরিককে হত্যা করে এক রক্তাক্ত কালো ইতিহাস রচনা করে।
এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে বিভিন্ন নামে অনেক জঙ্গি সংগঠন সৃষ্টি হয়।
তম্মধ্যে কয়েকটি সংগঠন নিম্নরূপ:
➤ ১) হিযবুল্লাহ (ইরানী শিয়া মদদ পুষ্ট), গঠনকাল: ১৯৮৫।
➤ ২) আল কায়েদা, গঠনকাল: ১৯৮৮।
➤ লশকর তাইয়েবা, গঠনকাল ১৯৯০।
➤ ৩) হুতি মিলিশিয়া বাহিনী (ইরানী শিয়া মদদ পুষ্ট), গঠনকাল: ১৯৯২।
➤ ৪) তালেবান, গঠনকাল: ১৯৯৪।
➤ ৫) আই এস বা দায়েশ, গঠনকাল: ১৯৯৯।

এছাড়াও এ সময়ের মধ্যেই আমাদের ভারত উপমহাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে বেশ কিছু জঙ্গি গ্রুপ সৃষ্টি হয় এবং তাদের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে অনেক রক্তাক্ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংঘটিত হয় যা সচেতন মানুষ মাত্রই অবগত আছেন)

কিন্তু সউদী আরব মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের নামে এসব জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ততার অপবাদের মুখোমুখি হয় বারবার।

❍ ৪) ১৯৯০ সালে ইরাকের সাদ্দাম বাহিনী কুয়েত দখল করে নেয় এবং সউদী আরবের আল খাফজী শহরেও সৈন্য প্রেরণ করে। এমন পরিস্থিতে সউদী আরব হস্তক্ষেপ করে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিষদের সাহায্য নিতে বাধ্য হয়। অবশেষে প্রায় ৭ মাস যুদ্ধ শেষে ২৬/০২/১৯৯১ তারিখে কুয়েত দখলদার মুক্ত হয়।
– কিন্তু সউদীর ভেতরের আলেম-ওলামাদের একটি গ্রুপ সউদী আরব কর্তৃক আন্তর্জাতিক বাহিনীর নিকট সাহায্য নেয়ার বিরোধিতা শুরু করে। এর নাম তারা দেয় সাহওয়াহ (জাগরণ)।
– তারা ঘোষণা দেয়, বিদেশী সেনাবাহিনীর সাহায্য নেয়া শরীয়তে নাজায়েয। তারা এও বলে যে, এটি সউদী আরব দখল করার জন্য পশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র। এই গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় ডক্টর সালমান আল আওদাহ, শাইখ নাসের আল উমর, সফর আল হাওয়ালী প্রমুখ এবং কতিপয় অনলাইন এক্টিভিস্ট। এরপর তারা সুগঠিত হয়ে সউদীর অভ্যন্তরে দেশ বিরোধী তৎপরতা শুরু করে।

– এ পরিস্থিতে সউদী সরকার বেশ কিছু ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে ডক্টর সালমান আল আওদাহ, সফর আল হাওয়ালী উল্লেখযোগ্য।

– এবার এদের মুক্তির দাবীতে তাদের অনুসারীদের দ্বারা সউদী আরবের আল বুরায়দা শহর সহ বেশ কতিপয় শহরে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। আল কাসীমের আমীর অফিসের সামনেও প্রচণ্ড বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

❍ ৫) আরব বসন্ত:

এরপর ২০১০ এর শেষ আর ২০১১ এর সূচনা লগ্নে শুরু হয় আরব দেশগুলোতে গৃহযুদ্ধ, রক্তপাত এবং চরম ধ্বংসাত্তক কার্যক্রম। তিউনেসিয়ায় এই বিদ্রোহের আগুন শুরু হয় পরে তা মিসর, লিবিয়া, ইয়েমন এবং সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

তারই সূত্র ধরে সউদী আরবে ‘হুনাইন বিপ্লব’ (১১ মার্চ ২০১১) নামে বিশংখলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
সউদী পূর্বাঞ্চলের আল আল আওয়ামিয়াতে প্রায় ৩০০ শিয়া সউদী সরকারে বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এছাড়াও আরও কয়েকটি শহরে এ ধরণের মিছিল বের হয়।
কিন্তু সউদী জনগণ তা ঘৃণ্যভরে প্রত্যাখ্যান করে এবং সরকার কঠোর হস্তে তা দমন করতে সক্ষম হয়।
কিন্তু দুভার্গ্য হলেও সত্য যে, একদল আলেম ও বক্তা টুইটার, ফেসবুক ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ সব বিশৃঙ্খলা মূলক কার্যক্রমে ইন্ধন যোগাতে থাকে।
তবে আল হামদুলিল্লাহ সউদী গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ইন্ধনদাতা বেশ কতিপয় উল্লেখযোগ্য আলেম/শাইখ এবং বিশাল ফলোয়ারধারী কতিপয় এক্টিভিস্টকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
তাদের মধ্যে ঐ সকল ব্যক্তিবর্গও আছে যারা একই কারণে ইতোপূর্বেও গ্রেফতার হওয়ার পর ছাড়া পেয়েছিল।

❖ মোটকথা, ১৯৭৯ সালের পর বিশ্বে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে একপ্রকার উগ্রতা ও চরমপন্থার আবির্ভাব হয় যার ঝাপটা সউদী আরবেও এসে আছড়ে পড়ে।
আর সারা বিশ্বে সুমহান জীবনদার্শ ইসলামের ব্যাপারে একপ্রকার ভীতি ও ইসলাম ফোবিয়ার সৃষ্টি হয়।

উপরোক্ত ঘটনাবলীকে সামনে রেখেই সম্ভবত: সউদী আরবের বর্তমান ক্রাউনপ্রিন্স এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন সালমান (হাফিযাহুল্লাহ) উগ্রতা ও চরমপন্থামুক্ত মধ্যমপন্থা, ভারসাম্যপূর্ণ সুমহান ইসলামের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

➲ মন্তব্য: মডারেট বা মধ্যমপন্থা ইসলাম দ্বারা যদি সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, চরমপন্থা প্রতিরোধ করা উদ্দেশ্য হয় তাহলে এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। পক্ষান্তরে মডারেটের নামে যদি ইসলামী আইন-কানুন শিথিল করে পাপাচার ও জুলুমের রাস্তা উন্মুক্ত করা হয় তাহলে তা অবশ্যই ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি এবং এ জন্য অবশ্যই সরকারকে মহান রবের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের গোপন উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত।

পরিশেষে দুআ করি, আল্লাহ তাআলা যেন দু হারামকে বুকে ধারণকারী, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্মভূমি, ইসলামের কেন্দ্রস্থল সউদী আরবকে সকল অকল্যাণ থেকে হেফাজত করেন। কালিমা খচিত সবুজ পতাকা যেন চিরকাল এ দেশের উন্মুক্ত আকাশে পতপত করে উড্ডীন থাকে আর যে বা যারা ইসলামের উপর আঘাত হানবে বা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে আল্লাহ যেন তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। আমীন।

আরও দুআ করি, সমগ্র মুসলিম বিশ্ব তাওহীদ ও সুন্নাহর দাওয়াতের আলোক উদ্ভাসিত হোক আর ধর্মনিরপেক্ষতা, কম্যুনিজম, নাস্তিক্যতাবাদ, পঁচা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ সহ সকল বাতিল মতবাদের ধ্বংসস্তুপের উপর ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হোক মহাগৌরবে। আল্লাহ তুমি কবুল কর। আমীন।
——————–
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব
০১-১১-২০১৭

This Post Has 3 Comments

  1. Zazzak Allah

  2. Jazakallah khair.

  3. খুব ই ব্যথিত হলাম। প্রিন্স কে এভাবে সমর্থন কিভাবে করা হতে পারে! আলেমরাই যদি এই মানুষগুলোর সাফাই গায়….. যাই হোক আশা করি আপনি তখন বুঝেন নাই। কিন্তু এখনকার প্রিন্সের কার্যকলাপ নিয়ে আপনার মতবাদ কি? কনসার্ট, সিনেমা হল, বিচ ইত্যাদি নিয়ে প্রিন্সের উদ্যোগ নিয়ে আপনার মন্তব্য কি?

Leave a Reply