আযান কি বিরক্তিকর?

আযান কি বিরক্তিকর?
লেখক: আবদুল্লাহিল হাদী মু.ইউসুফ

সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

2
ভূমিকা: আযান শব্দটি আরবী শব্দ। বাংলায় তার অর্থ হয়, ঘোষণা।
ইসলামের পরিভাষায় বিধি-বদ্ধ নির্দিষ্ট শব্দাবলী উচ্চারণ করে নামাযের সময় হওয়ার ঘোষণা দেয়াকে আযান বলা হয়।

ইসলামে ১ম হিজরীতে সাহাবী আবদুল্লাহ বিন যায়েদ এবং ওমর বিন খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহুমার) স্বপ্ন এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) স্বীকৃতির ভিত্তিতে আযানের প্রবর্তন হয়।(তিরমিযী, হা/১৮৯, আবু দাউদ, হা/৪৯৯ ও ইবনু মাজাহ, হা/৭৬১) ।
বিষয়টি অবতারণার কারণ: সমকালে বিভিন্ন মহল থেকে আযান নিয়ে কটূক্তি এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে! ফলে বিষয়টি নিয়ে মানুষের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। তাই স্বীয় ঈমানী দায়িত্ববোধ থেকে বিষয়টির গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কিছু আলোচনার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।
ইসলামে আযানের বিধান কি? আযান ফরযে কেফায়া। (ফতোয়া লাজনা দায়েমা 6/54)
আযানের বৈশিষ্টঃ আযান মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা এবং অমুসলিম এলাকার মাঝে পার্থক্য করে। যেমন নিম্নোক্ত হাদীসটি:

عن أنس بن مالك أن النبي صلى الله عليه وسلم كان إذا غزا بنا قوما لم يكن يغزو بنا حتى يصبح وينظر فإن سمع أذانا كف عنهم وإن لم يسمع أذانا أغار عليهم قال فخرجنا إلى خيبر فانتهينا إليهم ليلا فلما أصبح ولم يسمع أذانا ركب وركبت خلف أبي طلحة وإن قدمي لتمس قدم النبي صلى الله عليه وسلم قال فخرجوا إلينا بمكاتلهم ومساحيهم فلما رأوا النبي صلى الله عليه وسلم قالوا محمد والله محمد والخميس قال فلما رآهم رسول الله صلى الله عليه وسلم قال الله أكبر الله أكبر خربت خيبر إنا إذا نزلنا بساحة قوم فساء صباح المنذرين

আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই আমাদের নিয়ে কোন গোত্রের সাথে যুদ্ধ করতে যেতেন, ভোর না হওয়া পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করতেন না বরং লক্ষ্য রাখতেন, যদি তিনি তখন আযান শুনতে পেতেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা থেকে বিরত থাকতেন। আর যদি আযান শুনতে না পেতেন, তাহলে অভিযান চালাতেন।

আনাস (রা:) বলেন, আমরা খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম এবং রাতের বেলায় তাদের সেখানে পৌঁছলাম। যখন প্রভাত হল এবং তিনি আযান শুনতে পেলেন না; তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ার হলেন। আমি আবূ তালহা (রা:)-এর পিছনে সাওয়ার হলাম। আমার পা, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর কদম মুবারকের সাথে লেগে যাচ্ছিল।
আনাস (রা:) বলেন, তারা তাদের থলে ও কোদাল নিয়ে বেরিয়ে আমাদের দিকে আসল। হঠাৎ তারা যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখতে পেল, তখন বলে উঠল, ‘এ যে মুহাম্মদ , আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদ তাঁর পঞ্চ বাহিনী সহ!’ আনাস (রা:) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখে বলে উঠলেন: ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা যখন কোন কাওমের আঙ্গিনায় অবতরণ করি, তখন সতর্কীকৃতদের প্রভাত হবে কত মন্দ!’ (বোখারী -585)
আযানের ফযিলত:
ক) মুহাম্মাদ ইবনে সালামা (রহঃ) … আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবূ সাসাআ আনসারী আল-মাযিনী (রহঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাকে বলেছেন যে, আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) তাকে বলেছেন: “আমি তোমাকে দেখি তুমি বকরী চরাতে এবং মাঠে থাকতে ভালবাসো। যখন তুমি তোমার বকরীর পালের নিকট মাঠে থাক এবং নামাযের জন্য আযান দাও, তখন উচ্চস্বরে আযান দিবে। কেননা মুয়াজ্জিনের আওয়াজ যে পর্যন্ত পৌঁছবে, কিয়ামতের দিন ঐ স্থানের সকল জীন, মানুষ এবং প্রতিটি বস্তু তার সাক্ষ্য প্রদান করবে।”

আবূ সাঈদ (রা:) বলেন: আমি এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে শুনেছি।
সহিহ, বুখারি হাঃ ৬০৯১
খ) রাসূলুল্লাহ (ছা:) এরশাদ করেন যে, কিয়ামতের দিন মুয়াজ্জিনের গর্দান সবচেয়ে উঁচু হবে। [মুসলিম, মিশকাত ৬৫৪।]
আযান কি বিরক্তিকর?
হ্যাঁ, আযান বিরক্তিকর। তবে তা মানুষের নিকটে নয়; শয়তানের নিকট। তাই আযানের শব্দ শুনে বিরক্ত হয়ে সে পালিয়ে যায়। যেমন দেখুন নিম্নোক্ত হাদীটিতে-
আবূ হুরাইরা (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যখন সালাতের জন্য আযান দেয়া হয়, তখন শয়তান হাওয়া ছেড়ে পলায়ন করে, যাতে সে আযানের শব্দ না শোনে। যখন আযান শেষ হয়ে যায়, তখন সে আবার ফিরে আসে। আবার যখন সালাতের জন্য ইক্বামাত বলা হয়, তখন আবার দূরে সরে যায়। ইক্বামাত শেষ হলে সে পুনরায় ফিরে এসে লোকের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং বলে এটা স্মরণ কর, ওটা স্মরণ কর। বিস্মৃত বিষয়গুলো সে মনে করিয়ে দেয়। এভাবে লোকটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সে কয় রাক‘আত সালাত আদায় করেছে তা মনে করতে পারে না। (বোখারী ১২২২, ১২৩১, ১২১৩২, ৩২৮৫)
যারা আযানকে বিরক্তিকর মনে করে তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব:
যদি ইসলামী রাষ্ট্র এবং ইসলামী সরকার হয় তাহলে তার ব্যাপারে ইসলামী বিধি-বিধান অবলম্বন করা হবে। আর যদি ইসলামী রাষ্ট্র এবং ইসলামী সরকার না হয় তাহলে আমাদের দায়িত্ব তাকে বিষয়টি বুঝানো। যদি সে বুঝে বা সংশোধিত হয় তাহলে আলহামদু লিল্লাহ। অন্যথায় তার জন্য মহান আল্লাহর নিকট হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে হবে।
কেউ আযান নিয়ে কটূক্তি করলে তার ব্যাপারে উগ্রপন্থা অবলম্বন করা ইসলাম ও মুসলমানের কাজ নয়:
আল্লাহর বাণী:
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে তর্ককর সদ্ভাবে।” (সূরা নাহাল-125)
ইসলাম মানুষের জন্য এমন বিধানই প্রবর্তন করে যাতে মানুষের জন্য কোন না কোন কল্যাণ অবশ্যই রয়েছে। আর যার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ অকল্যাণ রয়েছে তা ইসলামের বিধান রূপে প্রবর্তন করা হয় না।
আযানের প্রথম শব্দ আল্লাহ এই শব্দটি যতদিন পৃথিবীতে উচ্চারিত হতে থাকবে ততদিন কেয়ামত হবে না:
عَنْ أَنَسٍ رضي الله عنه، أَنَّ رَسُولَ اللّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: “لاَ تَقُومُ السَّاعةُ حَتَّى لاَ يُقَالَ فِي الأَرْضِ: الله، الله”. رواه مسلم.
আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “ততক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীতে কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ আল্লাহ বলার মত কোন লোক থাকবে।” (মুসলিম)
অতএব আজকে পৃথিবীতে আযান হচ্ছে বলেই আমরা এবং আপনারা জীবন যাপন করতে পারছি, যেদিন তা থাকবে না তখন কিয়ামত হয়ে যাবে। তাই সাধু সাবধান! বাকশক্তি আল্লাহর দান। তা অপব্যবহার করে নিজের ক্ষতি না করা বুদ্ধিমানের কাজ। এখনো সময় আছে সঠিক পথে ফিরে আসার। হয়ত আগামী দিন আফসোস করা যাবে কিন্তু তা কাটা ঘয়ে লবণ ছিটাবে।

This Post Has One Comment

  1. Excellent article. It is important for us for the present time. However, in a non-muslim country we should step with great care and patience.

Leave a Reply