ইসলাম সম্পর্কে অভিযোগ: ‘ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তলোয়ারের মাধ্যমে আর মুসলমানরা অসহিঞ্চু।’ বাস্তবতা কতটুকু?

  অনেক সামাজিক গ্রন্থে যে দৃশ্যটি দেখানো হয় তা হল, একজন ঘোড় সোওয়ার। যার এক হাতে রয়েছে উন্মুক্ত তলোয়ার আর এক হাতে কুরআন। সে জোর করে মানুষকে ইসলামে দিক্ষীত করার জন্য যুদ্ধে ছুটে যাচ্ছে। মূলতঃ এ দৃশ্যটি ইসলামের প্রকৃত রূপ নয়। ইসলাম সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টির জন্য এ জাতীয় একটি কল্পিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

 ইসলাম কখনো অন্য কোন ধর্মাবলম্বীকে জোর করে ধর্মান্তরিত করতে বলেনি। বরং সকল ধর্মকে সম্মান করতে শিক্ষা দিয়েছে। সকল ধর্মাবলম্বীদেরকে প্রদান করেছে ধর্ম গ্রহণের স্বাধীনতা। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

  অর্থ: “দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হতে বহিস্কার করেনি তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়-পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনাঃ ৮)
ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ইসলাম সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছে। এ ব্যপারে আল্লাহ তা’আলা সুস্পষ্টভাবে বলেনঃ
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

 

অর্থঃ “দ্বীনের ক্ষেত্রে জোর-জবরদস্তী চলবে না। হেদায়াত এবং গোমরাহী স্পষ্ট হয়ে গেছে। যে ব্যক্তি ‘তাগুত’ কে অস্বীকার করল সে এমন ‘মজবূত হাতল’ ধরল যা কখনো বিচ্ছিন্ন হবার নয়। আল্লাহ সবকিছু শুনেন; সব কিছু জানেন।” (সূরা বাকারাঃ ২৫৬)

বিশিষ্ট খৃষ্টান মিশনারী টমাস ওয়ারনোল্ড ইসলামের প্রসার সংক্রান- এক গবেষণায় বলেন, “অন্যন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে জোর করে ইসলামে দিক্ষীত করার কোন পরিকল্পিত চেষ্টা কখনো হয়েছে কিংবা খৃষ্টান ধর্মকে সমূলে উৎখাতের জন্য সংগঠিতভাবে কোন যুলম-নির্যাতন পরিচালিত হয়েছে বলে আমরা শুনিনি। মুসলিম খলীফাগণ যদি উক্ত দুটি পরিকল্পনার কোন একটি বাস-বায়ন করতেন তবে এত সহজে খৃষ্টানদেরকে মূলৎপাটিত করতে সক্ষম হতেন যেভাবে রাজা ফার্ডিনেন্ট এবং রানী ইসাবেলা ইসলামকে স্পেনের মাটি থেকে উৎখাত করেছিল অথবা যেভাবে চর্তুদশ লুই ফ্রান্সে খৃষ্টান প্রষ্টেটান সমপ্রদায়ের অনুসারীদেরকে শাস্তি দিত।”

ইসলামী সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম একটি দায়িত্ব । যার প্রকিষ্ঠ উদাহরণ হল, ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন মুসলিম দেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়গুলোকে সংরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত রয়েছে।
মূলতঃ ধর্মীয় সহিঞ্চুতার ঘটনায় ইসলামের ইতিহাস পরিপূর্ণ। ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমার ইব্‌নুল খাত্তাব (রাঃ) ৬৩৪ হিজরীতে বিজয়ী বেশে যখন বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলেন তখন তিনি সেখানে অবস্থানরত প্রতিটি মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা দান করেছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে। আরো ঘোষণা করলেন, প্রতিটি মানুষের জান-মাল নিরাপদ এবং তাদের উপাসনালয়গুলোকে রক্ষা করার যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অনুরূপভাবে ইসলামী আইনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের জন্য আলাদা বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করা অনুমোদিত। যেখানে সংখ্যালঘুদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী পারস্পারিক বিষয়াদীর নিষ্পত্তি করা হবে।
মোটকথা, ইসলামী রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জান-মালকে পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক। ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। কুরআন বলে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নাই; সকল মানুষ সমান। ইরশাদ হচ্ছেঃ
“হে মানুষগণ, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মাঝে আল্লাহর নিকট সেই সবচেয়ে বেশী সম্মানিত যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু।” (সূরা হুজুরাতঃ ৪৯)

Leave a Reply