ইমাম ও ইমামতি (পর্ব-৮)

ইমাম ও ইমামতি (পর্ব-৮)

(ইমাম ও মুক্তাদীর বিবিধ ভুল-ত্রুটি]

আব্দুর রাকীব (মাদানী)

দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার, খাফজী (সউদ আরব)

[email protected]

আমরা এ পর্বে ইমাম ও মুক্তাদীর কিছু ভুল-ত্রুটি সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করবো ইন্ শাআল্লাহু তা’আলা। এসব ভুলের মধ্যে অনেক ভুল এমন রয়েছে যা ছোট প্রকারের কিন্তু তা থেকেও আমাদের সতর্ক থাকা উচিৎ যেন আমরা পূর্ণ সওয়াবের অধিকারী হতে পারি এবং এ সব ভুল যেন একটি স্বভাবে পরিণত না হয়।

১-ইমামের সুতরা ব্যবহার না করা।[বিস্তারিত তৃতীয় পর্ব দ্রষ্টব্য] ইমাম মসজিদে ইমামতি করুক বা মসজিদের বাইরে, যদি তার সামনে দেয়াল, পিলার, লাঠি বা এই জাতীয় কোনো আড় না থাকে তাহলে তাকে সুতরা করা প্রয়োজন। এ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ ব্যাপক অর্থবোধক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

“যখন তোমাদের কেউ নামায আদায় করবে, তখন সে যেন সুতরা সামনে করে নামায আদায় করে এবং সুতরার নিকটবর্তী হয়, তার ও সুতরার মাঝে কাউকে অতিক্রম করতে না দেয়।” [আবু দাঊদ, ইবনু খুযায়মাহ (৮১৮) বায়হাক্বী ২/২৬৭]

-চাঁদ-তারার নকশা আছে এমন জায়নামাযে নামায অবৈধ মনে করাঃ কিছু লোক এই কারণে সেই সব জায়নামাযে নামায আদায় অবৈধ মনে করে যে, মহান আল্লাহ চন্দ্র-সূর্যকে সাজদা করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু এটা তাদের বুঝার ভুল। কারণ এসব জায়নামাযে নামাযী চন্দ্র-সূর্যকে সাজদা করে না বরং আল্লাহকে সাজদা করে। চন্দ্র-সূর্যকে সাজদা করা আলাদা বিষয় আর চাঁদ-তারার উপর সাজদা করা আলাদা বিষয়। যেমন মাটিকে সাজদা করা ভিন্ন বিষয় আর মাটির উপর সাজদা করা ভিন্ন বিষয়। আমাদের ভাল করে জানা দরকার যে, মহান আল্লাহ শুধু চাঁদ ও সূর্যকে সাজদা করতে নিষেধ করেন নি বরং সকল সৃষ্টিকে সাজদা করতে নিষেধ করেছেন এবং কেবল তাঁকে সাজদা করতে বলেছেন যিনি এসবের সৃষ্টিকর্তা। হ্যাঁ, তবে এমন জায়নামাযে বা বিছানায় নামায না পড়াই ভাল, যাতে নকশা ও কারুকার্য থাকে, যার ফলে নামাযীর মনযোগে ব্যাঘাত ঘটে।

৩-কিবলামুখী হওয়ার গুরুত্ব না দিয়ে মাইক্রোফোনমুখী হওয়ার গুরুত্ব বেশী দেওয়া। লাউড স্পীকারে নামায পড়ান এমন অনেক ইমামকে দেখা যায়, তারা ইমামতির সময় লাউড স্পীকার ও স্টান্ডকে সম্মুখে ও নিকটে রাখার চেষ্টা করেন। আর এমন করতে গিয়ে অনেক সময় তারা কিবলা থেকে বেঁকে যান, যা ভুল। কারণ আমরা কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতে আদিষ্ট। স্বেচ্ছায় জেনে-বুঝে কিবলা থেকে বেঁকে দাঁড়ানো অবশ্যই আদেশ উল্লংঘন। আমাদের সোজা কিবলার দিকে দাঁড়ানো প্রয়োজন তাতে মাইক্রোফোন সম্মুখে আসুক বা দূরে থাক। এ ক্ষেত্রে ওয়্যারলেস বিশিষ্ট পকেট মাইক্রফোন ব্যবহার করা হলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।

৪-ইমাম ও মুক্তাদীর লাইন সোজা ও বরাবর না করা: অনেক ইমামকে দেখা যায়, মুয়াজ্জিনের ইক্বামত শেষ হওয়া মাত্রই তকবীরে তাহরীমা দিয়ে নামায শুরু করে দেন। আর অনেকে সেই সময় লাইন সোজা করার কথা বললেও সোজা হল কি না, তা ভ্রুক্ষেপ না করেই নামায আরম্ভ করে দেন। অন্যদিকে অনেক মুক্তাদী এমনও আছে যারা এটাকে ইমামের রুটিন মনে করে তাঁর কথার তোয়াক্কাই করে না; বরং অনেককে দেখা যায়, তার সামনের লাইনে স্থান খালি আছে তা সত্ত্বেও সেই স্থান পূরণ করে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন লাইন বরাবর করা, পূর্ণ করা, মাঝে ফাঁক না রাখা এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর আদেশ করতেন, তেমন তিনি ইক্বামতের পর স্বয়ং লাইনের দিকে মুখ করে বরাবর হওয়ার আদেশ করতেন, অনেক সময় লাইনের শেষে গিয়ে তাদের বরাবর করতেন। [বুখারী, আযান অধ্যায়, নং ৭১৯, সহীহ ইবনু খুযায়মা নং ১৫৫১-১৫৫২]

৫-বিশেষ শব্দের মাধ্যমে বিভিন্ন নামাযের নিয়ত পড়াঃ আরবী নিয়ত শব্দটির অর্থ, ইচ্ছা করা, মনস্থ করা। নিয়তের স্থান অন্তর। মনে মনে মানুষ যা ইচ্ছা করে তাই তার নিয়ত। তা সশব্দে নামায শুরু করার পূর্বে পড়া বা নিরবে বলা উভয়ই একটি ভুল এবং তা দ্বীনের বিধান মনে করে করা বিদআত। এমন নিয়ত করতে গিয়ে অনেকে ইমামের পরে পরে তাকবীরে তাহরীমা না দিয়ে অনেকটা দেরীতে দেয়, যা সুন্নার পরিপন্থী। আর অনেকে বিড় বিড় করে পড়ার কারণে তার পাশের নামাযীকে কষ্ট দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে নামায শুরু করতেন এবং অন্যকে তা দ্বারা শুরু করার আদেশ করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযে ভুলকারীকে শিক্ষা দেনঃ “যখন নামাযে দাঁড়াবে, পূর্ণরূপে অযু করে নিবে, অতঃপর কিবলামুখী হবে, তারপর তাকবীর দিবে, অতঃপর কুরআনের সহজতর যা তোমার মুখস্ত আছে তা পড়বে”।[বুখারী, নং৭৯৩]

৬-তাকবীর বলার সময় আল্লাহু আকবার এর (বা–) টেনে পড়াঃ  আযান হোক বা নামায, এই সময় আল্লাহু আক্ বার বলার সময় (বা) টান দিয়ে বলা নিষেধ। কারণ (বা) এ মাদ্দ দিলে অর্থ পাল্টে যায়। বিনা মাদ্দে (আকবার) অর্থ সবচেয়ে বড় আর মাদ্দ সহকারে  আকবা—র অর্থ, তবলা। ইমাম আল্লাহু আক্ বা—র দীর্ঘ করে বললে আরো একটি সমস্যা হয়ে থাকে, তা হলঃ ইমামের তাকবীর শেষ হওয়ার পূর্বে অনেক মুক্তাদীর তাকবীর শেষ হয়ে যাওয়া; কারণ মুক্তাদী তত দীর্ঘ করে বলে না। আর ইমামের পূর্বে তাকবীর দেওয়া নিষেধ। বিষয়টি যদি তাকবীরে তাহরীমার ক্ষেত্রে হয়, তাহলে নামায বাতিল হওয়ারও আশংকা থাকে। [ইরশাদাত আন বা’যিল মুখালাফাত, সাদহান,পৃঃ ৯৬]

আবার কিছু ইমামকে দেখা যায় তারা বিশেষ বিশেষ স্থানের তাকবীর টেনে বলেন আর বাকিগুলো সাধারণ ভাবে। যেমন তাশাহ্হুদে বসার সময় কিংবা রুকূ থেকে উঠার সময় কিংবা রুকূতে যাওয়ার সময়ের তাকবীর দীর্ঘ করেন আর বাকিগুলো স্বাভাবিক; অথচ এমন পার্থক্য করার কোনো দলীল নেই। তাই সব তাকবীর সাধারণতঃ বরাবর হবে এটাই সঠিক নিয়ম।

৭-তাকবীরে তাহরীমার সময় কান স্পর্শ করা এবং হাতের তালু চিপের দিকে রাখাঃ অনেক মুসাল্লীকে দেখা যায়, তারা নামায শুরু করার সময় কানের লতি স্পর্শ করে; অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কান স্পর্শ করতেন না বরং তাঁর হাতের আঙ্গুল অনেক সময় বাহু বরার উঠাতেন আর অনেক সময় কান বরাবর। যারা কানের লতি স্পর্শ করে, তারা আরো একটি ভুল করে তা হল, কানের লতি ছোয়াঁর কারণে তাদের হাতের তালু কানের দিকে থাকে; অথচ এই সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাতের তালু কিবলামুখী থাকতো। [আবু দাঊদ (৭৭৫) তিরমিযী (২৪২) মুসলিম (৩৯৮)]

৮-এমন বিশ্বাস রাখা যে, মুয়াজ্জিন ব্যতীত অন্য কেউ ইকামত দিতে পারে না: এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস “যে আযান দিবে সেই ইক্বামত দিবে” খুবই যয়ীফ। [সিলসিলা যয়ীফা নং (৩৫)] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মুয়াজ্জিনকে ইক্বামত দেয়ার আদেশ করলে সে ইক্বামত দিত। তাই ইমাম মুয়াজ্জিনকে যখন ইক্বামত দেওয়ার আদেশ করবেন, তখন সে ইক্বামত দিবে। আর মুয়াজ্জিনের অনুপস্থিতিতে ইমাম যাকে ইক্বামত দিতে বলবেন, সেই ইক্বামত দিতে পারে।

৯-নামাযে কিরাআত, দুআ ও যিকর পড়ার সময় জিহব্বা না নাড়িয়ে মনে মনে পড়াঃ অনেকে একাকি কিংবা ইমামের পিছনে নামায পড়ার সময়, কিরাআত, তাকবীর, রুকু-সাজদা সহ অন্যান্য স্থানের দুআ সমূহ মনে মনে পড়ে, যেন নামায কিছু কাজের নাম মুখে কিছু পড়ার নয়। জিহব্বা ও ঠোঁট না নাড়িয়ে মনে মনে কিছু বলা বা করার ইচ্ছা করা, সেটা অবৈধ কিছু হলেও আল্লাহ তাআলা তা পাকড়াও করবেন না। নবী (সাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা আমার উম্মতকে ক্ষমা করেছেন, যা তাদের অন্তর বলে”। [হাদীস সহীহ, দেখুন ইরওয়াউল গালীল নং ২০৬২] তাই মনের কথা শরীয়ার দৃষ্টিতে অবিবেচ্য। আর এমন হলে নামাযে মনে মনে সূরা, দুআ ও যিকর পাঠকারীর আমলও অধর্তব্য।

০-ইমামের পিছনে মুক্তাদীদের তাকবীর, রাব্বানা ওয়ালাকাল্ হাম্দ সহ ইত্যাদি দুআ-যিকর সশব্দে পড়াঃ  ইমামের পিছনে মুক্তাদীদের অবস্থা হচ্ছে সিররী অবস্থা। অর্থাৎ সূরা ফাতিহা সহ ইত্যাদি দুআ-যিকর নিরবে পাঠ করা। এসব সশব্দে পাঠ করা যেমন ভুল তেমন এমন করলে ইমাম সহ অন্যান্য মুক্তাদীদের খুশু-খুযুতে ব্যাঘাত ঘটে ও জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো সাহাবীর নির্দিষ্ট স্থানে সরবে কিছু পড়া একটি খাস বা নির্দিষ্ট ঘটনা, তা সাধারণ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

১১-নামাযে চোখ বন্ধ রাখা কিংবা আকাশের দিকে দেখাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের সময় তাঁর চক্ষু বন্ধ রাখতেন না; বরং তাশাহ্হুদের সময় তাঁর দৃষ্টি শাহাদাত (তর্জনী) অঙ্গুলির দিকে থাকতো এবং দন্ডায়মান অবস্থায় সাজদার স্থানে থাকতো। অনুরূপ তিনি নামাযের সময় আকাশের দিকে তাকাতে কঠোর ভাবে নিষেধ করতেন। অনেকে নামাযে একাগ্রতা সৃষ্টির জন্য এমন করে থাকে, যা সুন্নত বিরোধী। [আল্ কাউলুল মুবীন ফী আখত্বাইল মুসাল্লীন, পৃঃ ১১০-১১২]

১২-ঝটকা দিয়ে রুকূতে যাওয়া এবং ঝটকা দিয়ে রুকূ থেকে উঠাঃ অনেকে রুকূ করার সময় শরীরে একটা ঝটকা দিয়ে দ্রুত গতিতে রুকূতে যায় এবং এই সময় রুকূ অবস্থায় তার শরীরে কম্পন থাকে। দুই তিনবার কম্পনের পর তার শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। অনুরূপ সাজদা ও সাজদা থেকে উঠার সময় এবং সালাম ফিরানোর সময় অনেককে এমন করতে দেখা যায়, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামাযের পদ্ধতির বিপরীত। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকূ সাজদায় যাওয়ার সময় স্বাভাবিক ভাবে যেতেন, না দ্রুত যেতেন আর না অতি ধীর গতিতে।

১৩-সূরা ফাতিহা কিংবা সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা পাঠ শেষ করার পূর্বেই হাত ছেড়ে দেওয়া। এসময় সূরা-কিরাআত শেষ হওয়ার পর হাত ছাড়া উচিৎ।

১৪-ইমাম যখন ‘সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ’ বলেন, তখন মুক্তাদীদের অনেকে শুধু ‘রব্বানা ওয়ালাকাল্ হামদ’ বলে থাকে; অথচ ইমাম ও মুক্তাদী উভয়কে সামিআল্লাহু… এবং রাব্বানা ওয়া… বলা দরকার। [তামামুল্ মিন্নাহ, পৃঃ ১৯০-১৯১]

১৫-রুকূ-সাজদায় স্থীর না হওয়া অনুরূপ রুকূ-সাজদা থেকে উঠে বরাবর হয়ে স্থীরতা অবলম্বন না করা: মনে রাখা দরকার এদুটি নামাযের রুকন তা না করলে নামায বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায ভুলকারীকে রুকু-সাজদায় স্থীর হতে বলেন এবং উভয় স্থান থেকে উঠেও স্থীর হতে বলেন এবং তার পরে নামাযের পরের কাজটি করতে আদেশ করেন। [বুখারী, নং৭৫৭ মুসলিম নং ৩৯৭]

১৬-সাজদার সময় সাতটি অঙ্গ মাটিতে না রাখাঃ সাজদার সাতটি অঙ্গ হচ্ছে যথাক্রমে কপাল সহ নাক, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পার সামনের পাতা। অনেকে কপাল মাটিতে রাখে কিন্তু নাক রাখে না। আর অনেকে সাজদার সময় দুই পা মাটি থেকে উপরে রাখে কিংবা এক পা আর এক পার উপর রাখে, যা বড় ভুল। এই সময় উপরোক্ত সাতটি অঙ্গের মাধ্যমে সাজদা হবে। নবী (সাঃ) বলেনঃ “আমাকে আদেশ করা হয়েছে, যেন আমি সাতটি অঙ্গের উপর সাজদা করি”। [মুসলিম নং ৪৯১, তিরমিযী নং ২৭২] অন্য বর্ণনায় সাতটি হাড়ের কথা এসেছে।

১৭-সাজদার পদ্ধতিতে ভুল করাঃ সাজদা যেমন সাতটি অঙ্গের উপর হবে, তেমন সাজদার সময় দুই ঊরু থেকে পেট পৃথক থাকবে, দুই বাহু পার্শ্বদেশ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকবে, হাতের জঙ্ঘা (হাতের কুনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত অংশ) মাটি থেকে উপরে থাকবে মাটিতে বিছানো থাকবে না এবং দুই হাতের তালু দুই কাঁধ বা দুই কান বরাবর থাকবে। দুই পায়ের পাতার সামনের ভিতরের অংশ মাটিতে ঠেকে থাকবে, গোড়ালি সম্মিলিত ভাবে উপরে থাকবে এবং আঙ্গুলসমূহ কিবলামুখী থাকবে। [বিস্তারিত দেখুন,আল্ কাউলুল মুবীন, ফী আখত্বাইল মুস্বাল্লীন, মাশহূর হাসান, নং১৩৭-১৩৮]

১৮-অসুস্থতা কিংবা অন্য কারণে নামাযী মাটিতে সাজদা করতে অক্ষম হলে, বালিশ, টেবিল বা উঁচু কিছুতে সাজদা করাঃ নামাযী কোনো কারণে যদি সরাসরি মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে সাজদা করতে না পারে, তাহলে সে কোনো উঁচু যিনিস যেমন বালিশ, কাঠ, টেবিল কিংবা অন্য কিছুতে সাজদা করবে না; বরং যতটা পারবে সাজদার জন্য ঝুকবে এবং ইশারায় সাজদা করবে। আর রুকূ অপেক্ষা সাজদায় বেশী ঝুকবে। [ত্বাবারানী, সূত্র সহীহ, দেখুন সিলসিলা সহীহা নং (৩২৩)]

১৯-তাওয়াররুক ও ইফতিরাশে ভুল করা: ইফতিরাশ হল, দুই রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে তাশাহ্হুদে বসার সময় ডান পা খাড়া রাখা এবং বাম পায়ের উপর বসা। আর তাওয়াররুক হচ্ছে তিন বা চার রাকাআত বিশিষ্ট নামাযের শেষ বৈঠকে ডান পা খাড়া রেখে বাম পা ডান পায়ের জঙ্ঘার মাঝ দিয়ে বের করে দিয়ে নিতম্বের ভরে বসা। এই আমল অনেকে করেই না। আর অনেকে প্রথম তাশাহ্হুদে কিংবা দুই রাকাআত বিশিষ্ট নামাযের শেষ তাশাহ্হুদে তাওয়াররুক করে; অথচ এটা তিন বা চার রাকাআত বিশিষ্ট নামাযের শেষ বৈঠকে হবে। [হাদীস আবু হুমাইদ, বুখারী, নং (৮২৮)]

২০-লম্বা স্বরে সালাম ফিরানোঃ সালাম ফিরানোর সময় স্বাভাবিক নিয়মে সালাম ফিরানো সুন্নাত। এই সময় অনেকে সালামের কোনো শব্দ যেমন (আস্ সালা–মু) বা (বারাকা–তুহূ) দীর্ঘ স্বরে টেনে পড়ে। এই রকম টেনে বলার কারণে অনেক সময় মুক্তাদী ইমামের পূর্বে সালাম ফিরিয়ে দেয় নচেৎ ইমামের পূর্বে তার সালাম উচ্চারণ সমাপ্ত হয়ে যায়, যা অবশ্যই সুন্নাহ বিরোধী কাজ, যেটা ইমামের দীর্ঘ স্বরে সালাম ফিরানোর কারণে হয়ে থাকে।

২১-সালামের পর মুসাফাহা করাঃ অনেকে ফরয নামাযের সালামের পর তার ডান-বাম পাশের মুসল্লীর সাথে মুসাফাহ করে, যা একটি নতুন আমল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণ থেকে নামাযের সালাম শেষে মুসাফাহা করা প্রমাণিত নয়। অনেকে আবার বিশেষ করে ফজর ও আসর নামাযান্তে এমন করে থাকে। উল্লেখ্য যে, দূর থেকে আগত ব্যক্তির জন্য এটা সুন্নাহ যে, সে মুসলিম ভাইর সাথে সালামের পর মুসাফাহা করবে। তাই এমন ব্যক্তি হলে সে পাশের নামাযীর সাথে মুসাফাহা করতে পারে; নচেৎ না।[আল্ ইরশাদাত আন্ বা’যিল মুখালাফাত/১২০] এই মুসাফাহা করতে গিয়ে অনেকে নামাযীর যিকর ও তাসবীহ কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।

২২-আঙ্গুলের গিরা ছেড়ে তসবীহ দানায় তাসবীহ পাঠঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডান হাতে তাসবীহ পাঠ করতেন। [আবু দাঊদ নং (১৫০২) তিরমিযী নং (৩৪৮৪)] এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঙ্গুলের গিরায় তাসবীহ পাঠ করার আদেশ দেন এবং বলেনঃ  সেগুলোকে কথা বলানো হবে।”। [আবু দাঊদ নং (১৫০১) হাদীসটিকে হাকেম ও যাহাবী সহীহ বলেছেন, নভবী ও আসক্বালানী হাসান বলেছেন এবং আলবানী যয়ীফ বলেছেন] শাইখ আলবানী (রহ) বলেনঃ“ তসবীহ দানায় তাসবীহ পড়ার মন্দসমূহের মধ্যে একটিই যথেষ্ট যে, এই নিয়ম আঙ্গুলে গুণে গুণে তাসবীহ পড়ার সুন্নতকে শেষ করে দিয়েছে কিংবা প্রায় শেষ করে দিয়েছে”। [সিলসিলা যয়ীফা,১/১১৭]

২৩-ইমামের সাথে একজন মুক্তাদী থাকলে ইমামের একটু আগে অবস্থান করাঃ এ সম্পর্কে সহীহ নিয়ম হচ্ছে, ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ে এক অপরের বরাবর দাঁড়াবে। ইমাম একটু আগে অবস্থান করবে না আর না মুক্তাদী ইমামের একটু পিছনে দাঁড়াবে। ইমাম বুখারী এ সম্পর্কে এক অনুচ্ছেদ রচনা করেনঃ (অনুচ্ছেদ, দুই জন হলে মুক্তাদী ইমামের ডান পাশে তার বরাবর দাঁড়াবে) [বুখারী, আযান অধ্যায়, অনুচ্ছেদ নং ৫৭, হাদীস নং ৬৯৭] অতঃপর ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) এর ঐ ঘটনা উল্লেখ করেন, যাতে তিনি তার খালা উম্মুল মুমেনীন মায়মূনা (রাযিঃ) এর নিকট রাত অতিবাহিত করেন এবং রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে কিয়মুল লাইল আদায় করেন। মুসনাদ আহমদে বিষয়টি আরোও স্পষ্ট এসেছে। [দেখুন, সিলসিলা সহীহা, নং (৬০৬)]

২৪-নফল স্বালাত আদায়কারীর সাথে কেউ ফরয আদায় করার ইচ্ছায় তার সাথে শরীক হলে, নফল আদায়কারীর তাকে হাত দ্বারা বা ইশারা-ইঙ্গিতে সরিয়ে দেওয়া। এটি ভুল। [চতুর্থ পর্ব দ্রষ্টব্য]

২৫-নামায অবস্থায় হাই আসলে তা অপসারণের চেষ্টা না করাঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

“যদি তোমাদের কেউ নামাযে হাই তোলে, তাহলে সে যেন যথা সম্ভব তা চেপে রাখে; কারণ শয়তান প্রবেশ করে”। [আহমদ, মুসলিম নং২৯৯৫]

চেপে রাখার নিয়ম হবে, সে যেন তার হাত মুখে রাখে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

“যদি তোমাদের কেউ হাই তোলে, তাহলে সে যেন তার হাত মুখে দেয়”। [মুসলিম, নং২৯৯৫]

২৬-ফরয নামাযান্তে ইমাম ও মুক্তাদীদের সম্মিলিতভাবে দুআ করা। (বিস্তারিত আগামী পর্বে ইন্ শাআল্লাহ)

এছাড়াও ইমাম ও মুক্তাদীদের অনেক ভুল-ত্রুটি নামাযে ঘটে থাকে। কিন্তু এ স্থানে সব ভুলের আলোচনা সম্ভব নয়। তাই এই বিষয়ের এখানেই সমাপ্তি ঘটানো হল। তাছাড়া আমাদের ধারাবাহিক পর্বে বিভিন্ন স্থানে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো অনেক ভুল-ভ্রান্তির আলোচনা হয়েছে। আল্লাহর কাছে দুআ করি তিনি যেন আমাদের সঠিক সুন্নাহ অনুযায়ী নামায আদায় করার তাওফীক দেন এবং তা কবূল করেন। আমীন।

আরও পড়ুন:

This Post Has 3 Comments

  1. ALHAMDULILLAH ,az oneak ojana bisoy janlam,sukran sadik,

  2. ইমাম হওয়ার যোগ্য বেক্তি কে? কোনো ঘুসখোর, জুলুমকারী, প্রতারনাকারী, মিথ্যুক, অন্যকে দিয়া অবৈধ কাজ করানো, কথায়ে কথায়ে মিথ্যা প্রচারকারী, এক শ্রেনীর মানুষদের তোষামোদকারী বেক্তির পেছনে নামাজ পড়া যাবে কিনা? অথবা ওই বেক্তি ইমামমতি করতে পারবে কিনা, কোরান ও হাদিসের রেফারেন্স দিয়া সমাধান দিলে উপকৃত হব.

  3. ইমাম ও ইমামমতি পর্ব ৬ খুজে পাচ্ছি না।এর লিংক দিন। …প্লিজ

Leave a Reply