ইমাম ও ইমামতি-পর্ব (৩)

ইমাম ও ইমামতি-পর্ব (৩)

আব্দুর রাকীব মাদানী

নামাযের পূর্বে ইমামের করণীয়ঃ

১-আযানের পর কিছুক্ষণ বিরতি প্রদানঃ

আযানের পর এবং নামায শুরু করার পূর্বে ইমাম কতক্ষণ বিরতি দিবেন বা অপেক্ষা করবেন, তার কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা সহী হাদীস দ্বারা বর্ণিত নয়। তবে বিভিন্ন হাদীসের আলোকে কিছুক্ষণ বিরতি দেওয়া প্রমাণিত। কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ‘‘প্রত্যেক দুই আযানের মাঝে নামায রয়েছে’’। [বুখারী,নং ৫৮৮] অর্থাৎ আযান ও ইকামতের মাঝে নফল নামায আছে। এমনকি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাগরিবের ফরয নামাযের পূর্বেও নামায পড়ার আদেশ দেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ‘‘তোমরা মাগরিবের পূর্বে নামায পড়, তোমরা মাগরিবের পূর্বে নামায পড়, তৃতীয়বারে বলেনঃ যার ইচ্ছা।” [বুখারী নং ১১৮৩]

তাছাড়া আযানের উদ্দেশ্যই হল, লোকদের সংবাদ দেওয়া যে নামাযের সময় হয়ে গেছে, যাতে করে তারা অযু করে নামাযের প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হয়। তাই আযানের পর সময় না দিলে এই মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট নয়।

ইশার নামায সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি মসজিদে লোকদের অধিক হারে উপস্থিতি দেখতেন, তাহলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটু আগেই নামায শুরু করতেন আর যদি সংখ্যা কম দেখতেন তো একটু বিলম্ব করতেন। [বুখারী, নং ৫৬৫]

উপরোক্ত তথ্যানুসারে এটা স্পষ্ট যে, আযান ও ইকামতের মাঝে কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করা প্রমাণিত ও মুস্তাহাব। তবে নির্দিষ্টরূপে এর সময়সীমা কতখানি হবে তা বর্ণিত নয়। তাই বিভিন্ন নামাযের পূর্বে সুন্নতে রাতেবার দিকে লক্ষ্য রেখে, নামাযীদের দুর কিংবা নিকটে অবস্থানের দিকে লক্ষ্য রেখে এবং আরো অন্যান্য বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে ইমাম সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেন। অনুরূপ ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের সম্মতিতে যদি কোন সময় সুচী নির্ধারণ করা হয়, কিংবা সরকার বা মসজিদ কমিটির পক্ষ্য থেকে সময়সূচী নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যা সকলকে এক সাথে জামাআতের সাথে নামায আদায় করতে সহায়ক, তাহলে এই রকম করা অনুচিৎ নয়। তবে তাদের অবশ্যই খেয়াল রাখা দরকার যে, বিরতি যেন এত দীর্ঘ না হয় যাতে আউয়াল ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশংকা থাকে কিংবা এত কম না হয় যাতে লোকদের মসজিদে আসা ও সুন্নত পড়া বাধাগ্রস্থ হয়।

২-সুতরা না থাকলে সুতরা করে নেওয়াঃ

সুতরা উঁচু বিশিষ্ট এমন বস্তুকে বলে যা নামাযী তার সাজদার স্থানের সম্মুখে রাখে, যেন কেউ তার ভিতর দিয়ে অতিক্রম না করে এবং এর বাইরে যা কিছু ঘটে সেই দিকে নামাযীর ধ্যান না যায়।

দেয়াল, প্রাচির, বেড়া, খুঁটি, লাঠি, বর্শা, বল্লম, গাছ, পাথর, বাহন (গাড়ি-ঘোড়া) ইত্যাদি লম্বা কিংবা চওড়া বিশিষ্ট বস্তু সুতরার জন্য প্রযোজ্য। [মুগনী,৩/৮০, আল্ মুলাখ্খাস আল্ ফিকহী,৭২-৭৩]

ইমাম যখন তাঁর মিহরাবে (ইমাম দাঁড়ানোর স্থান) দেয়ালের নিকটে নামায পড়াবে তখন সেই দেয়াল তার সুতরা হিসেবে বিবেচিত হবে। তখন আর অন্য ভিন্ন সুতরা মেহরাবে রাখার প্রয়োজন নেই। তাই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মিহরাবে সুতরা থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ইমাম যদি মসজিদের মাঝে নামায পড়ায় কিংবা ফাঁকা স্থানে নামায পড়ায় অর্থাৎ সামনের স্থান খালি থাকে, কারো অতিক্রম করার আশংকা থাক কিংবা না থাক, তাহলে সামনে সুতরা রাখা মুস্তাহাব। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

” إذا صلّى أحدكم، فليُصلّ إلى سُترة، وليدْنُ منها”

“তোমাদের কেউ যখন নামায পড়বে, তখন যেন সে সুতরা সামনে করে নামায পড়ে এবং তার নিকটবর্তী হয়”। [আবু দাঊদ, নং ৬৯৮, ইবনু মাজাহ নং ৯৫৪, ইবনু খুযায়মাহ নং ৮৪১, সূত্র হাসান]

উপরোক্ত বিধানটি ইমাম ও একাকী নামাযী উভয়ের জন্য প্রযোজ্য তবে ইমাম সুতরা করলে আর মুক্তাদীদের সুতরা করার প্রয়োজন নেই, এটাই অধিকাংশ বিদ্বানের মত। [মুগনী,৩/৮১]

সুতরার দৈর্ঘতা এক বিঘত কিংবা এক গজ হওয়া এবং নামাযীর সাজদা ও সুতরার মাঝে একটি ছাগল পার হওয়ার মত ফাঁকা থাকা প্রমাণিত। [মুসলিম, অধ্যায়, সালাত,অনুচ্ছেদ, মুসল্লীর সুতরা,নং ১১১২, ১১১৪,১১৩৪/বুখারী নং ৪৯৪]

প্রকাশ থাকে যে, কিছু উলামা সুতরা করাকে ওয়াজিব বলেছেন, অনেকে সুন্নতে মুআক্কাদাও বলেছেন, তবে জমহূরে উলামা সুতরা করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। পারত পক্ষে এই বিধান পরিত্যাগ করা উচিৎ নয়।

৩-লাইন সোজা করার আদেশ প্রদানঃ

নামাযে দাঁড়ানোর সময় লাইন সোজা করা, বরাবর হওয়া, লাইনের মাঝে জায়গা ফাঁকা না রাখা এবং প্রথম লাইন পূর্ণ করার পূর্বে দ্বিতীয় লাইন তৈরি না করা ওয়াজিব আমলের অন্তর্ভুক্ত। এটি যেমন মুক্তাদীদের কর্তব্য তেমন ইমামেরও দায়িত্ব যে, সে নামায শুরু করার পূর্বে এর আদেশ করবে এবং যথাসম্ভব নিজে তা পর্যবেক্ষণ করবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামায শুরু করার পূর্বে বলতেনঃ

سوّوا صفُوفكم فإن تسوية الصف من تمام الصلاة” رواه البخاري و مسلم”

“তোমরা তোমাদের লাইন সোজা করে নাও কারণ লাইন সোজা করা নামাযের পরিপূর্ণতার অন্তর্ভুক্ত” [বুখারী, অধ্যায়ঃ আযান, নং ৭২৩/ মুসলিম, অধ্যায়ঃ স্বালাত, নং ৯৭৪]

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তকবীরে তাহরীমা দেয়ার পূর্বে আমাদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন এবং বলতেন তোমরা একে অপরের সাথে ঘেষে দাঁড়াও এবং সোজা হয়ে দাঁড়াও” [বুখারী, অধ্যায়ঃ আযান, নং ৭১৯/মুসলিম অধ্যায়ঃ নামায নং ৯৭৫]

৪-ইমামতির সময় ইমামের অবস্থানঃ

  • ক-ইমামতির সময় ইমাম মুক্তাদীদের তুলনায় উঁচু স্থানে অবস্থান করবে না। ইবনে মাসঊদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমামের কোন কিছুর উপরে অবস্থান করা আর মুক্তাদীদের তার থেকে নিম্ন স্থানে অবস্থান করা থেকে নিষেধ করেছেন।”।[দারা কুত্বনী, জানাযা অধ্যায়] তবে নামাযের নিয়ম-পদ্ধতি শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে ইমামের উঁচু স্থানে ইমামতি করা বৈধ। [বুখারী, মাসাজিদ অধ্যায়ঃ নং৯১৭]
  • খ-ইমামের সাথে যদি এক পুরুষ ব্যক্তি নামায পড়ে তাহলে সে ইমামের ডান দিকে দাঁড়াবে। যদি ভুল করে সে তার বাম পার্শে দাঁড়ায়, তাহলে ইমাম তাকে তার ডান পার্শে করে নিবে। আর ইমামের সাথে যদি দুই কিংবা দুইয়ের অধিক পুরুষ ব্যক্তি শুরু থেকে নামায পড়ার জন্য উপস্থিত থাকে, তাহলে ইমাম আগে বেড়ে নামায পড়াবে আর তারা পিছনে এক লাইনে দাঁড়াবে। যদি ইমামের সাথে এক ব্যক্তি নামায পড়তেছে এমতাবস্থায় দ্বিতীয় ব্যক্তি শরীক হতে চায়, তাহলে মুক্তাদী দুজন পিছনে চলে আসবে আর ইমাম নিজ স্থানে থেকে ইমামতি করবে। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তি যদি ইমামের বাম পার্শে গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে ইমাম তাদের দুই জনকে পিছনে করে দিবে।  যদি ইমামের সাথে পুরুষ, মহিলা ও নাবালেগ বাচ্চা নামায পড়ে, তাহলে পুরুষেরা ইমামের পিছনে লাইন করবে অতঃপর পুরুষ বাচ্চারা লাইন করবে অতঃপর মহিলারা। যদি ইমামের সাথে একজন পুরুষ ও এক বা একাধিক মহিলা নামায পড়তে চায়, তাহলে পুরুষ ব্যক্তি ইমামেন ডান পার্শে দাঁড়াবে আর এক বা একাধিক মহিলা পিছনে আলাদা লাইনে দাঁড়াবে। [দেখুন নায়লুল আউত্বার, শাওকানী, অধ্যায়ঃ ইমাম ও মুক্তাদীদের অবস্থান..অনুচ্ছেদ নং ২১০, ৩/২২৬-২২৯]
  • গ-সকল নাবালেগ বাচ্চাদের এক লাইনে দাঁড় করালে যদি তাদের গোলমাল করার এবং বড়দের নামাযে বিঘ্ন ঘটার আশংকা থাকে, তাহলে বড়রা বাচ্চাদের মাঝে মাঝে নিয়ে নামায পড়তে পারে। [শারহুল্ মুমতি, ইবনু উসাইমীন,৪/২৭৮]

৫-ইমাম মুসাফির হলে নামাযীদের বলে দেওয়া, যেন তারা নামায পূরণ করে নেনঃ

মুসাফির ইমামের পিছনে মুকীম নামায পড়লে, ইমামের সালামের পর নামায পূরণ করতে হবে। এই সময় মুসাফির ইমাম সালাম ফিরানোর পর বলবেঃ আপনারা নামায পূরণ করে নিন কারণ আমি মুসাফির। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা বিজয়ের সময় মক্কাবাসীদের ইমামতিকালে এইরূপ বলতেন। [আবু দাঊদ, সফর অধ্যায়, নং (১২২৯) মুআত্বা,২/২০৬] এই কথাটি নামাযের পূর্বেও বলা যেতে পারে। [মাজমুঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাঈল, ইবনে উসাইমীন/১৫/১৫৩]

নামাযরত অবস্থায় ইমামের করণীয়ঃ            

১-নামাযের রুকন ও ওয়াজিব কাজসমূহ পূর্ণরূপে সম্পাদন করাঃ

নামায পড়ানোর সময় ইমামের সবচেয়ে বড় করণীয় হচ্ছে, নামাযের রূকনগুলি ও ওয়াজিবগুলি পূর্ণরূপে ধীর-স্থিরতার সাথে সম্পাদন করা।কিয়াম, কুঊদ, রুকূ, সাজদা, রুকূ থেকে উঠা, দুই সাজদার মাঝে বসা ইত্যাদি কাজগুলি এমন ভাবে সম্পাদন করা যেন একটি কাজ শেষ হওয়ার আগে অপরটি শুরু না করা হয়। যেমন রূকূ থেকে উঠে ভালভাবে সোজা না হয়েই সাজদা করা। অনুরূপ এক সাজদা থেকে উঠে ভাল করে না বসেই দ্বিতীয় সাজদা করা। ফুকাহাগণ স্থিরতার সংজ্ঞায় বলেছেনঃ একটি কাজ করার সময় মানুষের অঙ্গের যেই নড়া-চড়ার প্রয়োজন হয় তা স্থির হওয়ার পর এতখানি স্থির থাকা যাতে ভালবাবে একবার তাসবীহ [সুবহানাল্লাহ] বলা সম্ভব হয়। উলামাগণের নিকট এই বিষয়টি ‘তা’দীলুল আরকান’ নামে পরিচিত, যা করা ওয়াজিব। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাড়াহুড়া করে নামায পাঠকারীকে পুনরায় নামায পড়ার আদেশ দেন। [বুখারী,নং ৭৯৩/ মুসলিম]

২-মুক্তাদীদের অবস্থার খেয়াল রাখাঃ

ইমামতির সময় ইমামকে খেয়াল রাখা উচিৎ যে, তার পিছনে মুক্তাদীদের অবস্থা একরকম নয়; বরং কেউ দুর্বল, কেউ অসুস্থ, কেউ বয়স্ক, কেউ প্রয়োজনীয় কাজের সাথে জড়িত এমনকি অনেক মায়ের সাথে তাদের ছোট সন্তানও থাকে। তাই লম্বা সূরা দ্বারা এবং যতটুকু যথেষ্ট তার অতিরিক্ত দুআ ও যিকির দ্বারা নামায দীর্ঘ না করা। একদা এক সাহাবী লম্বা সূরা দ্বারা নামায পড়ালে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে ‘সাব্বিহিস্মা রাব্বিকাল্ আ’লা, ওয়াশ্ শাম্ সি ওয়া যুহাহা’ দ্বারা নামায পড়াতে আদেশ করেন। [বুখারী, আযান অধ্যায়, নং ৭০৫] নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

” إذا صلّى أحدكم للناس فليُخفف، فإن منهم الضعيف والسقيم والكبير. و إذا صلّى أحدكم لنفسه فليطول ما شاء ” -رواه البخاري

“যখন তোমাদের কেউ লোকদের ইমামতি করবে, তখন যেন সে নামায হালকা করে, কারণ তাদের মধ্যে দুর্বল, অসুস্থ ও বয়স্ক লোক থাকে। আর যখন সে একা নামায পড়বে, তখন যত ইচ্ছা দীর্ঘ করবে”। [বুখারী, অধ্যায়ঃ আযান নং ৭০৩]

৩-প্রয়োজনে ইমামতির সময় অন্যকে স্থলাভিষিক্ত করাঃ

ইমামতিকালে যদি ইমামের অযু নষ্ট হয়ে যায় কিংবা আরো অন্য কারণে তাকে মাঝখানে নামায ছাড়তে হয়, তাহলে তার পিছনে উপস্থিত মুক্তাদীদের কাউকে তার স্থানে করে দিবে। ইমাম কাউকে নির্ধারণ না করলে স্বইচ্ছায় মুক্তাদীদের কেউ ইমাম হয়ে যাবে এবং বাকি নামায পূরণ করবে। এমতাবস্থায় সে ইমামের নায়েব/স্থলাভিষিক্ত ইমাম। সে নতুন করে নামায শুরু থেকে পড়াবে না; বরং যেখান থেকে পূর্বের ইমাম নামায ছেড়েছে সেখান থেকে বাকি নামায পূর্ণ করবে। উমর (রাযিঃ) কে ইমামতি কালে শত্রু ছুরি দ্বারা আঘাত করলে তিনি সাহাবী আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাযিঃ) কে স্থলাভিষিক্ত করেন। [ফাতাওয়া সউদী স্থায়ী উলামা পরিষদ,৭/৩৯৩-৩৯৫]

উল্লেখ্য, ইমাম যদি অযু ছাড়াই নামায পড়ায়, তাহলে তার নামায বাতিল কিন্তু মুক্তাদীদের নামায সহীহ। [ফাতহুল বারী,২/২৪৩] আর যদি কোন নির্দিষ্ট মুক্তাদী তার ইমামের বেঅযু সম্পর্কে জানতে পারে, কিন্তু অন্যরা তা না জানতে পারে, তাহলে যে জানে তার নামায বাতিল কিন্তু যারা জানে না তাদের নামায শুদ্ধ। এমতাবস্থায় ইমাম যদি নামাযরত অবস্থায় নিজের অযু নেই তা জানতে পারে, তাহলে সে ততক্ষণাৎ অন্যকে তার স্থানে স্থলাভিষিক্ত করে অযু করবে, আর নামায শেষ করার পর জানতে পারলে সে অযু করে নিজের নামায পুনরায় আদায় করবে।

অনুরূপ কোন ইমাম যদি জেনে-বুঝে নাপাকী নিয়ে নামায আদায় করে, তাহলে তার নামায বাতিল। কিন্তু সে যদি অজান্তে নাপাকী নিয়ে নামায পড়ে অতঃপর নামাযরত অবস্থায় তা জানতে পারে, তাহলে নামাযরত অবস্থায় তা দূর করা সম্ভব হলে দূর করবে যেমন জুতা, মোজা, টুপি বা পাগড়িতে নোংরা লেগে থাকলে তা খুলে ফেলে দিবে এবং নামায পূরণ করবে।[আবু দাঊদ নং (৬৫০/ইবনু খুযায়মা নং (১০১৭] আর নামাযরত অবস্থায় তা দূর করা সম্ভব না হলে নামায ছেড়ে অন্যকে ইমাম করে দিয়ে পাক হবে। তবে নামায শেষ করার পর তা জানতে পারলে সহীহ মতানুসারে তাদের পুনরায় নামায আদায় করতে হবে না। [ মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া,২২/১৮৪-১৮৫]

৪-নামাযে ছোট-বড় সূরা পাঠ ও বিশেষসূরা চয়নে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর তরীকা অবলম্বনঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূরা ফাতিহার পর সব নামাযে এক ধরনের সূরা পড়তেন না আর না সব নামাযের সময়সীমা এক হত; বরং তিনি কোন ওয়াক্তে দীর্ঘ সূরা পড়তেন আবার কোন সময়ে ছোট। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শেষের রাকাআতগুলির তুলনায় প্রথম রাকাআতের কিরাআত দীর্ঘ করতেন। তাই ইমামকে মুক্তাদীদের অবস্থা বুঝে এসব মুস্তাহাব বিষয়গুলিরও খেয়াল রাখা উচিৎ।

  • আবু ক্বাতাদাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেনঃ“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যহরের প্রথম দুই রাকাআতে সূরা ফাতিহা এবং আরো দুটি সূরা পড়তেন, প্রথমটি লম্বা করতেন এবং দ্বিতীয়টি সংক্ষিপ্ত আর অনেক সময় তাঁর আয়াত পড়া শোনা যেত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসরে সূরা ফাতিহা এবং আরো দুটি সূরা পাঠ করতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের নামাযের প্রথম রাকাআত দীর্ঘ করতেন আর দ্বিতীয়টি সংক্ষিপ্ত”। [বুখারী, অধ্যায়ঃ আযান, হাদীস নং ৭৫৯]  
  • অন্য বর্ণনায় এসেছে, “তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম রাকাআত যতখানি দীর্ঘ করতেন ততখানি দ্বিতীয় রাকাআতে করতেন না। এই ভাবে তিনি আসর ও সাকালেও করতেন”। [বুখারী, নং ৭৭৬]
  • অনুরূপ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমআর ফজরে, জুমআর নামাযে, দুই ঈদের নামাযে এবং বিতরের নামাযে বিশেষ সূরা বেশীরভাগ সময়ে পড়তেন, তাই ইমামকেও তা করা মুস্তাহাব। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমআর দিনে ফজরের প্রথম রাকাআতে আলিফ্ লাম্ মীম তানজীল্ আস্ সাজদাহ (সূরা সাজদাহ) এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা দাহ্ র পাঠ করতেন। [বুখারী, জুমআ অধ্যায়, নং৮৯১] আর জুমআর নামাযের প্রথম রাকাআতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ‘আ’লা’ (সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল্ আ’লা) এবং দ্বিতীয় রাকাআতে ‘গাশিয়াহ্’ (হাল্ আতাকা হাদীসুল্ গাশিয়াহ) পাঠ করতেন। এমনকি জুমআর দিনে যদি ঈদ একত্রিত হত, তাহলে জুমআহ ও ঈদ উভয় নামাযে এই দুটি সূরা পাঠ করতেন। [মুসলিম, জুমআহ অধ্যায়ঃ নং ২০২৫/আবু দাঊদ/তিরমিযী]
  • তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমআর নামাযের প্রথম রাকাআতে সূরা ‘জুমুআহ্’ এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা ‘মুনাফেকূন’ ও পাঠ করতেন। [মুসলিম, অধ্যায় জুমুআহ, নং২০২৩/আবু দাঊদ নং১১২৪/তিরমিযী নং৫১৯]
  • তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক সাথে তিন রাকাআত বিতর পড়লে প্রথম রাকাআতে সূরা ফাতিহার পর সূরা আ’লা, দ্বিতীয় রাকাতে ‘কাফেরূন’ এবং তৃতীয় রাকাআতে সূরা ‘ইখলাস’ পাঠ করতেন। [সহীহ সুনান নাসাঈ নং১৬০৬]

৫-সালাম ফিরানোর পর মুক্তাদীদের দিকে মুখ করে ফিরে বসাঃ

ইমাম সালাম ফিরানোর পর কিবলামুখী হয়ে বেশীক্ষণ থাকবেন না বরং; তিনিবার আস্তাগ্ ফিরুল্লাহ এবং একবার আল্লাহুম্মা আনতাস্ সালাম ও মিনকাস্ সালাম তাবারাকতা ইয়া যাল্ জালালি ওয়াল্ ইকরাম বলতে যতক্ষণ সময় লাগে ততক্ষণ শেষে মুক্তাদীদের দিকে মুখ করে বসবেন, এটাই সুন্নত। মুক্তাদীদের দিকে ফিরার সময় ডান দিক কিংবা বাম দিকে ঘুরে অতঃপর মুসল্লীদের দিকে মুখ করে বসা, উভয় নিয়ম প্রমাণিত। [বুখারী, আযান অধ্যায়ঃ নং ৮৫২, মুসলিম, অধ্যায়ঃ মুসাফেরীনদের নামায, নং৭০৮/শারহুল মুমতি,৪/৩০৫-৩০৬]

 চলবে ইনশাআল্লাহ

বিঃ দ্রঃ লেখকের ভিডিও লেকচার শুনতে ইউটিউব সার্চে লিখুন Abdur Raquib Bokhari-Madani

দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার, খাফজী, সউদী আরব।

[email protected]

আরও পড়ুন:

ইমাম ও ইমামতি (১ম পর্ব)
ইমাম ও ইমামতি (পর্ব-২)

 

Leave a Reply