থার্টিফার্স্ট নাইট ইসলামী সংস্কৃতি নয়

সারাবিশ্বে চলছে এখন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মহোত্সব। বছরের নানা দিন নানান দিবসের ছলনায় যুবক-যুবতীদের চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয় এর মাধ্যমে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় শিকার বাংলাদেশসহ বিশ্ব মুসলিম সমাজ। থার্টিফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইন’স ডে, এপ্রিল ফুল ইত্যাদি বিভিন্ন নামে বছরজুড়ে যে উত্সব পালন করা হয় তার প্রধান টার্গেট মুসলিম সমাজের যুবক-যুবতীরা। এসব উত্সবের মধ্যে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা, নগ্নতা ও ধোঁকাবাজিসহ সচ্চরিত্র নষ্ট করার সব আয়োজন থাকে ব্যাপকভাবে। এসব অপসংস্কৃতি মূলত ভোগবাদী পশ্চিমা দেশ থেকে আমদানি করা। থার্টিফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষ বরণ উত্সব এখন বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আড়ম্বরতার সঙ্গে উদযাপিত হয়। প্রথমে পশ্চিমা বিশ্বে চালু হলেও মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি ও গ্লোবাইলাইজেশনের জোয়ারে বিশ্বের আনাচে-কানাচে, অলিতে-গলিতে এটি ব্যাপৃত হয়েছে। বাংলাদেশেও বিগত ১০ বছর যাবত ইংরেজি বর্ষবরণ খুব জোরেশোরে উদযাপিত হচ্ছে এবং এটি দিন দিন ডালপালা ছড়িয়ে মহীরুহে পরিণত হচ্ছে।
এক.
আসলে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন একটি অপসংস্কৃতি। ইউরোপ-আমেরিকাসহ অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে ইংরেজি নববর্ষকে বরণ করে নেয়ার জন্য ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে শেষ রাত অবধি থাকে নানা ধরনের আয়োজন। থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের মধ্যে থাকে গভীর রাতে নর-নারীরা রাস্তায় নেমে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ব্যাপক উদোম নৃত্য, নাইটক্লাবে গিয়ে নগ্ন ড্যান্স, মদ পান করে মাতলামি ও বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক অশ্লীল কর্মের ব্যাপক আয়োজন। থাকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা। কপোত-কপোতির মাঝে চলে দীর্ঘ চুম্বনের কঠিন প্রতিযোগিতা। থার্টিফার্স্ট নাইটে বল্গাহীন আনন্দে গা ভাসাতে সব যুবত-যুবতী একাকার হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। ব্যাপক হৈ-হুল্লোড়-চিত্কার, নানান তালের বাদ্য-বাজনা ও ধ্বনি দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। মোবাইল, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন মাধ্যমে একে অপরকে বিভিন্ন ধরনের গ্রিটিংস বা নতুন বছরের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়। এ উপলক্ষে বিভিন্ন হোটেল, পতিতালয়, পানশালা, নাচঘর, ক্লাবঘর, নাইটক্লাব সেজে উঠে নতুন সাজে। তারা সবাই যেন করজোড়ে ডাকছে—‘চলে এস মোর ভুবনে, মেতে উঠ নব আনন্দে’।
দুই.
থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে গিয়ে অন্যের কোনো ডিস্টার্ব হলো কিনা এসবের কোনো তোয়াক্কা নেই উত্সবকারীদের মাঝে। অন্যের ঘুম কিংবা অসুস্থতা এসবের ভ্রূক্ষেপ করার সময় যে তাদের নেই। এটি এমন এক অপসংস্কৃতি যা অন্যের সতীত্বকে কেড়ে নেয়। নারী, মদ ও বল্গাহীন অশ্লীলতা না হলে যেন নববর্ষ উদযাপনের ষোলকলা পূর্ণ হয় না। অপসংস্কৃতির এই জোয়ার এখন আর পশ্চিমা দেশে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বিভিন্ন মুসলিম দেশসহ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। প্রতি বছর এই রাতকে সামাল দিতে র্যাব-পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। কখন কার ইজ্জত লুণ্ঠন হবে এই ভয়ে সবাই থাকেন তটস্থ! বেশ কয়েক বছর আগে ঢাবির টিএসসিতে বাঁধন নামের এক মেয়ের ইজ্জত নিয়ে বিকৃত রুচির কিছু যুবক মেতে ওঠে অসভ্য আনন্দে। এরপর থেকে প্রত্যেক বছরই টিএসসি তো বটেই, রাজধানীর নানা স্থানে নানা অঘটনের মধ্য দিয়েই এ রাতটি উদযাপিত হয়।
তিন.
যে উত্সব অন্যের পবিত্রতা কেড়ে নেয়, কেড়ে নেয় মানুষের ঘুম ও স্বস্তি, যে উত্সবকে শান্তিপূর্ণ রাখতে আর্মি-পুলিশ ও র্যাবকে নিয়োগ দিতে হয় সেটি আর যাই হোক কোনো ভালো উত্সব হতে পারে না। যারা উত্সবের কথা বলে অন্যের ইজ্জত ও সতীত্ব কেড়ে বিকৃত আনন্দে মেঠে উঠতে পারে তারা আর যা-ই হোক কোনোভাবেই সভ্য হতে পারে না। কোনো সভ্য মানুষ অন্যের অধিকার নষ্ট করে নিজের বিকৃত সুখ মেটাতে পারে না। ইসলাম ধর্ম এ ধরনের অপসংস্কৃতিকে সাপোর্ট করে না। ইসলামের কোনো আনন্দ উত্সবে অন্যের অধিকার নষ্ট হয় না। বরং ইসলামের উত্সবের মধ্যে রয়েছে নিজেকে উত্সর্গ করে অন্যকে আনন্দ দেয়ার সব ধরনের আয়োজন। এটিই পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতির মধ্যে বড় তফাত। ইসলামী উত্সবকে কেন্দ্র করে র্যাব-পুলিশকেও তটস্থ হতে হয় না। সবকিছুই হয় শান্তিপূর্ণভাবে। অশান্তি সৃষ্টি করে কোনো উত্সবই ইসলাম বৈধ মনে করে না।
চার.
কোনো মুসলিম যুবক-যুবতী অমুসলিমদের মতো নিজেদের অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিতে পারে না। কেননা অমুসলিমদের ওইসব আনন্দ ফুর্তিতে তাদের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ওটাই তাদের সংস্কৃতি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওটাই তাদের ধর্ম। কিন্তু একজন মুসলমানের রয়েছে ধর্মীয় নির্দেশনা। যে নির্দেশনার আলোকে প্রত্যেক মুসলমান চলতে বাধ্য। আনন্দ-ফুর্তি করা যাবে কিন্তু তা অবশ্যই পরিচ্ছন্ন হতে হবে। মদ, জুয়া, জিনা-ব্যভিচার ও কোনো ধরনের অশ্লীলতা ইসলাম সহ্য করে না। অন্যের আনন্দ কেড়ে নিজে আনন্দ করাকে ইসলাম পছন্দ করে না।
পাচ. 
মুসলমান হিসেবে একজন ব্যক্তির বছর শেষে অনুশোচনা করা উচিত। আমি বিগত বছর কীভাবে কাটালাম, কতগুলো পাপ ও অন্যায় করলাম—এই হিসাব কষা উচিত। আমার ভালো কাজের চেয়ে যদি মন্দ কাজের পরিমাণ বেশি হয় তার জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে আগামী দিনে সুন্দর কর্মের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা দরকার। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষের হায়াত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেই নির্ধারিত জীবন থেকে আমার একটি বছর ঝরে গিয়ে আমি মৃত্যুর দিকে একধাপ এগিয়ে গেলাম। আমি কী করে মৃত্যুর কাছাকাছি এসে এত আনন্দ-ফুর্তি করি? একবারের জন্য হলেও এটি মনে করা উচিত। আমরা একজন ফাঁসির আসামির দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখি, তিনি নির্দিষ্ট দিনের জন্য অপেক্ষা করেন এবং তওবা-ইস্তেগফার করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত হন। অথচ আমরা ওই একই পথের পথিক হয়েও পরপারে পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি না নিয়ে বিকৃত আনন্দে মেতে ওঠি!
পরিশেষে বলব, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হিসেবে অবশ্যই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে লালন করতে হবে। কোনো রকম বিজাতীয় অপসংস্কৃতিকে লালন করা যাবে না। অপসংস্কৃতির মধ্যে আছে হারানোর মর্মবেদনা; পাওয়ার নেই কিছুই। যে আনন্দ অন্যের অধিকার, শান্তি, সুখ ও সতীত্বকে কেড়ে নেয় সেসব সংস্কৃতিকে আমরা ধিক্কার জানাই। আর যেসব উত্সব-আনন্দ অন্যকে কোনো রকম কষ্ট না দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ধনী-গরিব সবাইকে আনন্দ দিতে পারে আমরা তাকে স্বাগত জানাই। সব সুস্থ ও সুন্দর সংস্কৃতির বিকাশ হোক, এই প্রজন্মের নর-নারীর কাছে এই প্রত্যাশাই করছি ইংরেজি নববর্ষের শুরুতে। আল্লাহ সবাইকে কল্যাণ করুন। আমীন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

উৎস:আমার দেশ অনলাইন। 

This Post Has 2 Comments

  1. জাযাকাল্লাহু খাইরান।

  2. জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Leave a Reply