Sun. Aug 1st, 2021

ঈদের দিনে রাখিও মোদের স্মরণে

ডাউনলোড (পিডিএফ)

আল্ হাম্ দু লিল্লাহ্ , ওয়াস্ স্বালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ্ , আম্মা বাদ:
ঈদ আসছে, খুশির মুহূর্ত আসছে, আসছে আনন্দঘন সময়। কিছু দিনের মধ্যে তা আমাদের নিকট এসেও যাবে। পশ্চিমাকাশে নব চন্দ্র উঁকি দিতেই আমরা অনেকে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠবো। রাত্রিতে ঈদের দিনের কর্মসূচী তৈরি করে নিব। সেই দিনের আগমনে সমাপ্ত হবে এ বছরের মুবারক রামাযান মাস। আমরা সানন্দে সাজ-সকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বেশ-ভুষায়, আতর-পারফিউম লাগিয়ে, সবান্ধবে ও সপরিবারে উপস্থিত হবো ইদগাহে। পরি-অপরিচিত সবার সাথে শুরু হবে সালাম-মুসাফাহা এবং কোলাকুলি। আল্লাহু আকবারের ধ্বনিতে মুখরিত হবে ঈদগাহ প্রাঙ্গণ। শুভেচ্ছা বিনিময় করতে করতে সবাই বাসায় ফিরবো। সিমাই দিয়ে শুরু হবে খাবার আয়োজন। রকমারি খাবারে ভরে থাকবে অনেকের দস্তরখান। অতঃপর শুরু হবে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা-স্বাক্ষাৎ। চলবে উপহার বিনিময়। এই আনন্দ মুহূর্ত মলিন হতে হতে অতিবাহিত হয়ে যাবে কয়েকদিন।
কিন্তু এই সময়ে পৃথিবীর বহু স্থানে এমন কিছু মুসলিম ভাই আছেন যাদের স্মরণ রাখা আমাদের ঈমানী ও নৈতিক কর্তব্য। নচেৎ আমরা তাদের সাথে ইনসাফকারী হব না। তাদের খুশিতে শরিককারী তো দূরের কথা তারা যে আমাদের ভাই, তারা যে দ্বীন তথা মানবতার অটুট অঙ্গ এই স্বীকৃতিটাও দেওয়া হবে না।
• যখন আমরা ঈদের খুশিতে ডুবে থাকবো, তখন আমাদের ঐ সকল ব্যক্তিদেরও স্মরণ করা উচিৎ যারা এই রামাযান মাসেই আমাদের সাথে ছিল, আমাদের সাথে তাদেরও ঈদ করার কথা ছিল কিন্তু ঈদ আসার পূর্বেই তারা এই ধরাধম ত্যাগ করেছে। কিংবা অনেক দিন পূর্বেই তারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আজ আমরা ঈদ উদযাপন করছি কিন্তু তারা অনুপস্থিত। তাদের স্থানটা আমাদেরও হতে পারতো। কিন্তু আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিয়েছেন।
আল্লাহ গো! তোমারই সমস্ত প্রশংসা যতক্ষণ তুমি সন্তুষ্ট না হও। আবার তোমারই প্রশংসা যখন তুমি সন্তুষ্ট হবে। অতঃপর সন্তুষ্টির পরেও তোমারই প্রশংসা।
হে আল্লাহ! তুমি আমাদের মৃতদের ক্ষমা কর এবং সমস্ত মুসলিমের মৃতদের ক্ষমা কর। তাদের প্রতি রহম কর। তাদের জান্নাত নসীব কর। আমীন!
• যখন আমরা সুস্থ-সবল শরীরে সানন্দে ঈদ উদযাপন করবো, তখন আমাদের স্মরণ করা উচিৎ সেই সমস্ত ভাইদের যারা অসুস্থতার কারণে আমাদের সাথে ঈদগাহে উপস্থিত হতে পারেনি। যারা হাসপাতালের বেডে কিংবা বাসার খাটে পীড়া যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ে আছে। হয়ত: কেউ সপ্তাহ ধরে, কেউ মাস ধরে আর কেউ বছর বছর ধরে এই অবস্থায় এপাশ ওপাশ করছে। তাদেরও তো আমাদের সাথে ঈদ করার ইচ্ছা হয়। আল্লাহ আমাদেরকে সুস্থ রেখেছেন নচেৎ আমরাও তাদের স্থানে হতে পারতাম।
আল্লাহ গো! তুমি আমাদের এবং সারা জগতের অসুস্থদের আরোগ্য দান কর। আমীন।
আমাদের কর্তব্য হবে, যেন আমরা এই দিনে তাদের দেখা-স্বাক্ষাৎ ও সেবা-শুশ্রুষা, করি তাদেরকে তাদের প্রয়োজনীয় ও পছন্দনীয় আহার ও হাদিয়া প্রদান করি।
• আমরা যখন নিরাপদে আশঙ্কা মুক্ত শান্ত পরিবেশে ঈদ উদযাপন করছি, তখন আমাদের তাদের স্মরণ করা উচিৎ যারা শত্রুর রাইফেল ও বন্দুকের গুলির ভয়ে এবং ট্যাঙ্কের ভয়ঙ্কর দাপটে নিজ গৃহে আবদ্ধ। বাইরে বের হওয়াটা যাদের জন্য জীবনের হুমকি। যারা ধারাবাহিক যুদ্ধে নিজ পরিবারের আপনজনদের হারিয়েছে। কেউ কলিজার টুকরা সন্তান হারিয়েছে, কেউ পৃথিবীর বড় ধন পিতা-মাতা হারিয়ে অনাথ হয়েছে, কেউ সহধর্মিণী স্ত্রীকে হারিয়েছে, কেউ জীনব সাথী স্বামীকে হারিয়ে বিধবা হয়েছে, কেউ কঠোর পরিশ্রমে সঞ্চিত নিজের মূল্যবান মাল-সম্পদ লুণ্ঠন হতে দেখেছে এবং কেউ অতি কষ্টে নির্মিত স্বপ্নের বাসস্থান চোখের সামনে ধূলিসাৎ হতে দেখেছে। মাথা গোঁজানোর স্থান নেই তাই ফুটপাথে গাছের নিচে পলিথিন ও তিরপল দিয়ে নিজ নীড় নির্মাণ করেছে। তাদের করুণ অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে মনে পড়ে গেল কিছু দিন পূর্বে খবরে প্রকাশিত এক ফিলিস্তিনী মায়ের ঘটনা। যখন সে ফুটপাথে তার সন্তান জন্ম দেয়, তখন সে তার আদরের কোচি শিশুর মুখের দিকে হতাশা ও বেদনা মিশ্রিত মায়াবী নজরে তাকানোর সময় বলছিল: [কিছু মনে করো না মা! কারণ আমার মাও আমাকে এই ফুটপাথেই জন্ম দিয়েছিল। আজ তুমিও ফুটপাথেই জন্ম লাভ করলে। ফুটপাথই আমাদের ভাগ্য।]
আজ ফুটপাথেই তাদের ঈদ। ফুটপাথেই তাদের আনন্দ! আমাদের অবস্থাও তাই হতে পারতো কিন্তু আল্লাহ আমাদের শান্তিতে রেখে ঈদ পালন করার তাওফীক দিয়েছেন। তাই তাঁরই সকল প্রশংসা। আল্লাহ তুমি তাদের দেশে শান্তি দাও! তাদের অন্ন-বস্ত্র দান করো। আমীন।
• আমরা যখন নতুন জামা-কাপড় ও সুন্দর বেশ-ভুষায় সজ্জিত হয়ে ঈদগাহে নামায আদায় করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবো এবং নামায শেষে বাসায় ফিরে আদরের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের ঈদের উপহার প্রদান করবো এবং তাদের সাথে কুশল বিনিময় করবো, তখন আমাদের স্বরণে থাকা উচিৎ যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বর্মার মুসলিম পরিবাররাও এমনই প্রত্যাশা করে। কিন্তু চোখের সামনে রাস্তা-ঘাটে এবং আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আপন জনদের লাশ দেখলে ঈদ উদযাপন করা যায় কি? দা, কুড়াল ও ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত শরীরে ঈদ পালন করা যায় কি? এর পরেও ঈদের নামায পড়লে তারা ফিরবে কোথায়? কারণ হায়না বৈদ্ধরা তাদের তো নিজ গৃহে হত্যা করে এবং বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের কুড়ো ঘরগুলিকেও আগুন দিয়ে ধু ধু করে জ্বালিয়ে দিয়েছে। যেন পুনরায় তারা বাসায় না ফিরে আর ফিরলেও যেন নিজের সুপরিচিত জম্মস্থানটিও চিনতে না পারে। প্রাণে বেঁচে কিস্তী ও ডিঙ্গীতে চেপে যারা প্রতিবেশী মুসলিম ভাইর দেশে ঠাঁই পাবার বড় আশা নিয়ে কিনারায় এসেছিল, তখন তারা দেখতে পেল আর এক অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুর দৃশ্য। দেখলো তাদের নৌকা থেকে হাত ধরে স্থলে তুলার বদলে সেই দেশের আরমীরা তাদের দিকে বন্দুকের নালা পেতে আছে। খবরদার! কেউ যেন আমাদের দেশে পা না ফেলে নচেৎ গুলি করে দেব। এটা মানব নামের দানব জাতিসংঘের আদেশ আর আমরা তা কঠোর ভাবে পালন করতে মজা পাচ্ছি। নৌকা থেকে দুই হাত জোড় করে বাংলাদেশের মাটিতে মাথা গোঁজানোর উদ্দেশ্যে এক বিঘত স্থানের ভিক্ষা চাইলেও নৌকার আরোহীদের সমুদ্রের দিকেই ঠেলে দেওয়া হয়। ফিরে যাও, তোমাদের আমরা চিনি না, জানি না। সমুদ্রেই ডুবে মর তাতে আমাদের সামান্য দুঃখও নেই আফসোসও নেই।
হায় মুসলমান! হায় মানবতা! আজ আমরা যদি তাদের স্থানে হতাম। কিন্তু আল্লাহ আমাদের নিরাপদে শান্তিতে রেখেছে তাই তাঁরই শুকরিয়া। এই সময়ে আমাদের যে কোনো ভাবে সেই দুস্থ, নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং মজলূম ভাইদের সহযোগিতা করা ও তাদের পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য ও দায়িত্ব।
• ঈদ উপলক্ষ্যে আমরা যখন রকমারী রুচিকর খাবার ভক্ষণ করছি, তখন আমাদের সেই সমস্ত নিঃস্ব ও দরিদ্র লোকদের কথা স্বরণ করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ, যারা এই খুশির দিনেও অন্য-বস্ত্রের চিন্তা হতে মুক্ত হতে পারেনি তাই এক দিকে দলে দলে লোকেরা যখন নামাযে যাচ্ছে তখন তারা ঈদগাহ কিংবা মসজিদের গ্যাটে নচেৎ রাস্তার পার্শ্বে হাত ও ঝোলা প্রসারিত করে যাতায়েতকারীদের কাছে ভিক্ষাদানের করুণ আবেদন জানাচ্ছে। আনন্দের এই দিনে আমাদের জন্য উচিৎ হবে আমরা যেন তাদের উদ্দেশ্যে কিছু খাস করে রাখি।
• আনন্দের এই দিনে আমরা যখন নতুন পোশাকাষে সুসজ্জিত হয়ে আনন্দ করার সুমতি পেয়েছি, মিষ্টি-মিষ্টান্ন বিতরণ করার সুযোগ পেয়েছি, মন পছন্দ টেবিল ভরে আহারের সুব্যবস্থা করতে পেরেছি এবং এক অপরের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছি, তখন আমাদের পৃথিবীর সেই সকল ভাইর কথা স্বরণ করে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিৎ, যারা চরম দুরভিক্ষের কবলে অনাহারে জীবন যাপন করছে। খাদ্যাভাবে তাদের গোশ্ত শূন্য শরীরে কেবল চামড়ার আবরণ পড়ে রয়েছে। একটি কংকাল এবং তাদের দেহের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য পরিলক্ষীত হয় না। মনে পড়ে যায়, ইন্টারন্যাট এবং ফেসবুকে বহু চর্চিত এক মাননীয় সউদী মুফিতীর টিভির চ্যান্যালে প্রশ্ন কালে ক্রন্দনের দৃশ্য। সুদুর দুরভিক্ষকবলিত সোমিলিয়ার এক মুসলিম রোযাদার ভাই প্রশ্ন করেঃ শাইখ, আমাদের মধ্যে যদি কারো অবস্থা এমন হয় যে, তার কাছে না তো সাহরী খাওয়ার এক টুকরা রুটি আছে আর না ইফতার করার জন্য এক ঢোক পানি, তাহলে তার রোযা হবে কি? শায়খ এই প্রশ্ন শুনে ডুকরে কেঁদে ফেলেন। পৃথিবীতে মুসলিম ভাইর অবস্থা এমনও আছে! এই রকমও প্রশ্ন হতে পারে! সাহরীর আহার নেই, ইফতারী করার কিছু নেই!
বন্ধুগণ! কে জানে হয়তঃ তারা আজ আবারও আমাদের কাছে প্রশ্ন করেঃ শায়খ! যদি ঈদগাহে যাবার জন্য জামা না থাকে এবং ঈদগাহ থেকে ফিরে এসে সিমাই খাবার না থাকে তাহলে আমাদের ঈদ হবে কি?
• সঙ্গত কারণে পৃথিবীর হাফ সেঞ্চুরিরও বেশি সংখ্যায় মুসলিম শাষকদের অবস্থা মনে পড়ে যাচ্ছে, আজ মুসলিম জাতি ও মুসলিম ভাইদের উপর যখন বর্বর নির্যাতন চলছে তখন জাতির উদ্দেশ্যে আপনাদের একটু বিবৃতিও আসে না। খবরের পাতায় এক লাইন মন্তব্যও থাকে না। টিভির পর্দায় এক বাক্যের বক্তব্যও শোনা যায় না। আসলে এটাই কি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ধ্বজা ধরা চেয়্যার! যেই আষণে আপনারা অধিষ্ঠিত তার মূল্য, ক্ষমতা ও দায়িত্ব কি এতটুকু?!
• ঈদ উদযাপনের এই খুশির মুহুর্তে যখন আমরা এক ময়দানে সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড় পরে একত্রিত হয়েছি, তখন আমাদের সেই দিনের স্বরণ করা উচিৎ যেই দিন মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট নগ্ন পা ও বস্ত্রহীন অবস্থায় হাশরের ময়দানে পুনরুত্থিত হব। আল্লাহ বলেনঃ “সে দিন মানুষ পলায়ন করবে নিজ ভাই, মাতা, পিতা, পত্নী ও সন্তান হতে।” [আবাসা/৩৪-৩৬] সে দিনের প্রস্তুতি নিন কারণ মুমিনের জন্য সেটাই প্রকৃত প্রস্তুতি।
• আল্লাহ তুমি আমাদের সিয়াম , কিয়াম ও যাকাতুল ফিতর কবুল কর। আমাদের পাপ সমূহ ক্ষমা কর । রোযার পরেও রোযার মাসের মতই সৎ কাজ করার তাওফীক দাও। মনে রাখবেন, তারা খুবই মন্দ সম্প্রদায় যারা মহান আল্লাহকে কেবল রামাযান মাসে চেনে, অন্য মাসে চেনে না। কুল্লু আ’ম ওয়া আন্ তুম্ বিখাইর! তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম! ঈদ মুবারক!

দুআর আশাবাদী, আব্দুর রাকীব (মাদানী)

দাঈ, দাওয়াত সেন্টার, খাফজী, সউদী আরব।
তাং ২৭ই রামাযান ১৪৩৩

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহিল হাদী

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সউদী আরব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *