শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের অধিকার; বাংলাদেশের দায়িত্ব

মিয়ানামারের রোহিঙ্গারা আমাদের ভাই। ওরা মুসলিম, বাংলায় কথা বলে, দেখতে বাংলাদেশিদের মতো বলে তারা মিয়ানমারে বর্ণবৈষম্যের শিকার। রাখাইন প্রদেশে দাঙ্গার শিকার এই রোহিঙ্গারা আজ মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হতে চাইছে তারা। কিন্তু বাদ সেধেছে বাংলাদেশ সরকার। পুশ ব্যাক করা হচ্ছে তাদের।

নিজ দেশে পরবাসী এই অসহায় বনি আদমরা পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ থেকে মানবিক সহায়তাটুকু পাচ্ছে না। অথচ নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের দিক বিবেচনায় এসব অসহায় মানুষকে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামরিক কিংবা অন্য কোনো কারণে নির্যাতিত হয়ে যারা নিজ দেশ থেকে পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় চায়, তারাই রিফিউজি।

এদের ব্যাপারে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক হয়রানি থেকে রেহাই পেতে প্রত্যেকের অধিকার আছে অন্য কোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার।

রিফিউজি বা উদ্বাস্তু সম্পর্কিত বিশেষ আন্তর্জাতিক আইনটির নাম ‘কনভেনশন রিলেটিং টু দ্য স্ট্যাটাস অব রিফিউজি ১৯৫১’। এই আইনের ৩৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো দেশ রিফিউজিদের এমন কোনো পার্শ্ববর্তী দেশে বহিষ্কার কিংবা ফেরত পাঠাতে পারে না, যেখানে তাদের ধর্ম, বর্ণ, কিংবা কোনো দলের সদস্য হওয়ার কারণে জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একই আইনের ৩১ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে প্রবেশের দায়ে কোনো রিফিউজিকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।

শুধু তাই নয়। একই আইনের ১২ থেকে ৩০ নং অনুচ্ছেদে রিফিউজিদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয়প্রদানকারী দেশের নাগরিকদের মতোই বেশ কিছু ক্ষেত্রে অধিকার পাবার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইলে বাংলাদেশ সরকার এদের পুশব্যাক এবং ক্ষেত্রবিশেষে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করছে; যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান রেখেছে যে, দেশটি যেন এসব শরণার্থীকে পুশ ব্যাক না করে। তাসত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার সেদিকে কর্ণপাত করছে না।

মানবিক বিপর্যয়ের এই কঠিন মুহূর্তে এসব নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিপক্ষে বাংলাদেশ সরকার কোন যুক্তি খাড়া করছে, সেটা বোধগম্য নয়।

রোহিঙ্গারা কবে কোন অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল, সেগুলোকে সামনে এনে অসহায় মানুষগুলোকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে উন্মুক্ত সমুদ্রে। একদিকে বিজিবি আরেকদিকে নাসাকা বাহিনীর বন্দুক তাদেরকে খুঁজে ফিরছে। সমুদ্রে ঘুরতে ঘুরতে সেখানেই তাদের সলিল সমাধি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করো’ কিংবা ‘মানুষ মানুষের জন্য’- মানবতার এসব মহান বুলি আজ মিথ্যে হতে চলেছে।

কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিনের সাধারণ জনগণ রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে চাইলেও সরকার নমনীয় হচ্ছে না এতটুকুও। গর্ভবতী নারীকে পর্যন্ত আশ্রয় না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।

সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, মানবতার দিকে তাকিয়ে এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। সাময়িক সময়ের জন্যে হলেও এদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন প্লিজ….

লিখেছেন: সরকার মারুফ। 

Leave a Reply