রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চলছে অকথ্য বর্বরতা

রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চলছে অকথ্য বর্বরতা

॥ মুহাম্মদ আমিনুল হক ॥

ছবিগুলো বড় করে দেখতে ছবির উপর ক্লিক করুন:

ভিডিও ডকুমেন্টরী:

[youtube=http://www.youtube.com/watch?v=buQrDMDLc8U&feature=relmfu]

 

[youtube=http://www.youtube.com/watch?v=1wfWzluEhTs&feature=relmfu]

মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন প্রদেশে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৮ জুন শুক্রবার মংডুতে রোহিঙ্গা মুসলমান ও বৌদ্ধ রাখাইনদের মধ্যে এই দাঙ্গার সূত্রপাত। এতে বহু লোকের হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। কয়েক দিন আগে বাসে আক্রমণ করে রাখাইনরা ১০ মুসলিম রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মুসলিম রোহিঙ্গারা গত শুক্রবার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যায়। এখন সেখানে কারফিউ জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত দাবি করা হলেও রোহিঙ্গা মুসলমানের ওপর যে খড়গ নেমে এসেছে, তা সীমান্তের এপাড়ে বসে সহজে অনুমান করা যায়। ইতোমধ্যে সেখানে প্রায় ৪০০ জন মুসলিম রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। আকিয়াব শহরে পাশে অবস্থিত প্রাচীন ‘শফি খান জামে মসজিদের’ ইমাম মাওলানা জিয়াউল হককেও হত্যা করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের শত শত বাড়িঘর জ্বলছে লেলিহান অগ্নিশিখায়। বাংলাদেশে ঢুকতে না পেরে গুলি খাওয়া, জখম হওয়া শত শত মুসলিম নারী-পুরুষ নাফ নদীতে ভাসছে আর মৃত্যুর প্রহর গুনছে!
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরা বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠী। এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, মতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি, এখন তারাই ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বলির শিকার। মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়াম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে। ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, এই উপমহাদেশ ও দণি-পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে ক’টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তথা রাখাইন প্রদেশ তার অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানি মুসলমানের বংশধর। একসময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন ২০০ বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভি হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোগল শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের ওপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। দীর্ঘকাল মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে। ১৭৮০ সালে বর্মি রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেন। তিনিও ছিলেন ঘোর মুসলিমবিদ্বেষী। বর্মি রাজা ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকেন। ১৮২৮ সালে বার্মা ইংরেজদের শাসনে গেলে মুসলিমদের কিছুটা স্বস্তি আসে। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মার স্বায়ত্তশাসন লাভের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা করা হয়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তারা থেকে যায় ভাগ্যবিড়ম্বিত। স্বাধীন দেশের সরকার তাদেরকে নাগরিকত্ব দূরে থাক, মানবিক অধিকারটুকুও দেয়নি। বছরজুড়ে নাসাকা বাহিনী ও বৌদ্ধদের হামলার শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশসহ বিশ্বের আনাচে-কানাচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এরা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সরকার যে নাগরিক আইন করেছে, তাতে তিন ধরনের নাগরিকের কথা বলা হয়েছে। এই তিন শ্রেণীর মধ্যে নেই রোহিঙ্গারা। সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের ভোটাধিকার নেই। নেই কোনো সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার। নিজ দেশে পরবাসী তারা। তারা মিয়ানমারের অন্যান্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। একসময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু। রাখাইনদের সেখানে এনে মুসলিমদের সংখ্যালঘু বানানো হয়েছে।
এই ভাগ্যহত মুসলিমদের কি কোনো ঠাঁই হবে না? এরা কি আজীবন নিপীড়িত হতে থাকবে? প্রায়ই দেখা যায়, যখন আরাকানি মুসলিমদের ওপর নাসাকা বাহিনী কিংবা অন্য কেউ অত্যাচার, খুন-গুম শুরু করে, তখন তারা প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে অন্য কোথাও আশ্রয় নেয়ারও সুযোগ পায় না। হয় তাদের নাফ নদীতে ডুবে মরতে হবে, না হয় নিজ দেশের হিংস্র হায়েনাদের সামনে জীবন সঁপে দিতে হবে। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাস্তবে মিয়ানমারের পে কাজ করছে। তারা মিয়ানমার সরকারকে মুসলিম নিধন বন্ধে চাপ প্রয়োগ ও মুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানের কথা না বলে পার্শ¦বর্তী বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আহ্বান করছে। সত্যিই আজব ব্যাপার! আমাদেরকে আরো একটি বিষয় আহত করেছে, সেটি হচ্ছে মুসলিম রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিয়ে তথাকথিত সুশীল গণমাধ্যমের কোনো মাথাব্যথা নেই। পাশের একটি দেশে হাজার হাজার মুসলিম রোহিঙ্গার ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হলেও তাদের মানবতাবোধ জাগ্রত হচ্ছে না। শত শত মুসলিম নিধনের খবরকে গুরুত্ব দেয়ার চেয়েও মিয়ানমার সরকার আশ্রিত রাখাইন বৌদ্ধদের বাঁচানোর(!) নিউজ এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো কিংবা এ দেশে বহু বছর ধরে পড়ে থাকা উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের সিরিজ রিপোর্ট প্রকাশে তারা ব্যস্ত। সীমান্তের ওপারে নাসাকা, বৌদ্ধদের কর্তৃক নির্বিচারে মুসলিম নিধন কিংবা নাফ নদীতে আহত ও অসহায় নারী-পুরুষের সলিল সমাধির মতো কঠিন দৃশ্যও তাদের তাড়িত করছে না। একটি শীর্ষ দৈনিক প্রতিবেদন ছাপিয়েছে, ‘রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ অবশ্যই ঠেকাতে হবে’। এভাবে না লিখে পত্রিকাটি লেখতে পারত যে ‘রোহিঙ্গাদের নিধন প্রতিরোধ করতে হবে’, তাহলে উটপাখির মতো মাথা গোঁজা হতো না নিশ্চয়ই। আসলেই রোহিঙ্গা মুসলিমরা বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যহত জাতি। ওদের পাশে কেউ নেই। জাতিসঙ্ঘের ভাষায় ওরা ‘রাষ্ট্রহীন নাগরিক’।

বর্তমান সভ্যতা সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিদের ফিলিস্তিনের ভূমিতে বসতি গেড়ে দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে আলাদা করে খ্রিস্টানদের স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছে। কিন্তু এই সভ্যতা আজো কাশ্মিরি জনগণের অধিকার কিংবা মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের এক কালের শাসক ও সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থায়ী নাগরিকদের নাগরিকতার সনদও জোগাড় করে দিতে পারেনি। ওদের কাছে মুসলমানের রক্তের সেল কোনো মূল্য নেই। শুধু ওরা কেন? আমরাও বা ওদের জন্য কী করতে পেরেছি? এক মুসলিমের বিপদে অন্য মুসলিম কি পাশে দাঁড়াতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি?

এই মুহূর্তে পবিত্র কুরআনের এই আয়াতখানি শুধু মনে পড়ছে, ‘তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য লড়বে না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে? তারা ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের রব! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীরা জালেম এবং তোমার প থেকে আমাদের কোনো বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী তৈরী করে দাও (সূরা আন-নূর : ৭৫)। মিয়ানমারের মজলুম মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ সমগ্র মুসলিম জাহান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাই।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
[email protected]

লেখাটি  সংগৃহীত এখান থেকে।

এ প্রসঙ্গে  আরও দেখুন এখানে। 

Leave a Reply